ধান চালের ব্যবসায়ী সাধন চন্দ্র খাদ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে চালের দামে রেকর্ড

609

টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করতে চলা শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় অনেকগুলো চমক এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে উত্তরের জেলা নওগাঁর এক নেতাকে খাদ্যমন্ত্রী করা।নওগাঁ-১ (নিয়ামতপুর-পোরশা-সাপাহার) আসনের থেকে তিনবার নির্বাচিত সাধন চন্দ্র মজুমদার হচ্ছেন নতুন খাদ্যমন্ত্রী, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কৃষি পরিবারে। পারিবারিক সূত্রেই ধান-চালের ব্যবসায় জড়িত তিনি।তাকে খাদ্যমন্ত্রী করায় শেখ হাসিনা বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন সাধনকে চেনা নওগাঁর আওয়ামী লীগ নেতারা।

জেলার প্রবীণ নেতা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম ফজলে রাব্বি বলেন, “সাধন চন্দ্র মজুমদার কৃষক পরিবারেই বেড়ে উঠেছেন এবং তিনি নিজেও কৃষি পেশায় নিয়োজিত। কাজের উপযুক্ত ক্ষেত্র তিনি পেয়েছেন। তার হাত ধরে শুধু নওগাঁ নয়, সারা দেশে কৃষি ও কৃষকের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।”

বাংলাদেশের চালের যোগানের একটি বড় অংশ আসে উত্তরের জেলাগুলো থেকে, ওই জেলাগুলোর মধ্যে নওগাঁ অন্যতম। সেখান থেকে এই পেশায় জড়িত একজনকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া, তিনি পূর্বসূরিদের চেয়ে ভালো করবেন বলে মনে করছেন নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা চন্দন।

চালের দাম নিয়ন্ত্রণে নেই, আমদানিতে সরকার

বছরটা শুরু হয়েছিল চাল রপ্তানিতে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়ে। শেষ হচ্ছে আমদানিতে শুল্ক কমানোর মধ্য দিয়ে। মাঝখানে দাম বাড়তে বাড়তে মোটা চালের কেজি ৫০ টাকা ছুঁয়েছে, যা গত মার্চেও ৩২ থেকে ৩৪ টাকা ছিল। এখন চালের চড়া দামে বিপাকে পড়েছে দেশের নিম্ন আয়ের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার গতকাল রোববার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, চাল আমদানিতে মোট করভার ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন শুল্কহারে চাল আমদানি করতে আগামী ১০ জানুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারবেন আমদানিকারকেরা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের মতো চাল আমদানি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে না। কেউ আমদানি করতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করতে হবে।

মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিলে এরপর তারা আমদানির প্রক্রিয়ায় যেতে পারবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা হবে।

চাল আমদানিতে মোট করভার ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন শুল্কহারে চাল আমদানি করতে আগামী ১০ জানুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারবেন আমদানিকারকেরা।
সাধন চন্দ্র মজুমদার, খাদ্যমন্ত্রী
এই সিদ্ধান্ত এমন একটি সময়ে এল, যখন আমনের ভরা মৌসুম চলছে। আর আগামী বোরো মৌসুমে আবাদের সময়ও ঘনিয়ে আসছে। এর আগে বিপুল পরিমাণে আমদানির কারণে পরপর কয়েক মৌসুম ভালো দর না পাওয়া কৃষক এবার আমনে বেশ ভালো দাম পেতে শুরু করেছিলেন।

অবশ্য চালের মজুত বাড়াতে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে আমদানির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছিল। তবে সেটা শুধু সরকারিভাবে। যদিও সরকার নিজেরা তিন লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও উৎসাহ দিল। সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারিভাবে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কৃষক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

বছরের শুরুতে রপ্তানি ভর্তুকি

ঢাকার বাজারে এখন মোটা গুটি ও স্বর্ণা চালের কেজি ৪৮-৫০ টাকা, যা গত বছরের এ সময়ের চেয়ে ৪৮ শতাংশ বেশি বলে জানাচ্ছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। অন্যদিকে মাঝারি চাল কেজিপ্রতি ৫৩ থেকে ৫৮ টাকা ও সরু চাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশে এর আগে ২০১৭ সালে চালের দাম সবচেয়ে বেশি ছিল। ওই বছর হাওরে ফসল নষ্ট হয় এবং বন্যায় বোরো মৌসুমের উৎপাদন প্রায় ৮ লাখ টন কম হয়। এর প্রভাবে একই বছর অক্টোবরে মোটা চালের কেজি ৫০ টাকায় ওঠে। সরকার এর আগে জুলাই মাসেই (২০১৭) চালের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনে।

গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চাল রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে একটি সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দাবি করেন, চাল উদ্বৃত্ত ৪৪ লাখ টন। পরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক চাল রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ ভর্তুকির প্রজ্ঞাপন জারি করে। যদিও রপ্তানির অনুমতি আর দেওয়া হয়নি।

শুল্ক কমানোর পর ২০১৭–১৮ অর্থবছরেই ৪২ লাখ টন চাল দেশে আসে। বাজারে দাম পড়ে যায়। কৃষকেরা ধানের ভালো দাম পাওয়া থেকে বঞ্চিত হন। এরপর ২০১৯ সালের মে মাসে চাল আমদানিতে করভার বাড়িয়ে ৫৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ওই বছর বোরোতে বেশ ভালো ফলন হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ও গত বছরের শেষ দিকে চাল রপ্তানিতে বেশ উদ্যোগী হয়ে উঠেছিল। গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চাল রপ্তানিতে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে একটি সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দাবি করেন, চাল উদ্বৃত্ত ৪৪ লাখ টন। পরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক চাল রপ্তানিতে ১৫ শতাংশ ভর্তুকির প্রজ্ঞাপন জারি করে। যদিও রপ্তানির অনুমতি আর দেওয়া হয়নি।

গত বোরোতে ২ কোটি ২ লাখ টন চাল উৎপাদিত হয়েছে বলে জানাচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ লাখ টন বেশি। বাড়তি উৎপাদন বাজারে তেমন প্রভাব ফেলেনি। বোরোর শেষ দিকে গত জুলাই থেকে চালের দাম বাড়ছিল। ফলে করোনাকালে আয় কমে যাওয়া মানুষ সংকটে পড়ে চাল নিয়ে।

বাজার সামাল দিতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ও আমদানির জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনুমতি নিয়ে রেখেছিল গত আগস্ট মাসের শুরুতেই। যদিও আমদানি সহজ করা হয়নি। এর বদলে বারবার আমদানির ঘোষণা দেওয়া ও ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। সর্বশেষ পদক্ষেপ হলো চাল আমদানিতে শুল্ক কমানো।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সঠিক সময়ে চাল আমদানি না করায় বেশি দামের কারণে সাধারণ দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থেকে বরাদ্দ কমিয়ে চালের পেছনে ব্যয় বাড়াতে হয়েছে।
এম আসাদুজ্জামান, সাবেক গবেষণা পরিচালক, বিআইডিএস
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান মনে করেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় সঠিক সময়ে চাল আমদানি না করায় বেশি দামের কারণে সাধারণ দরিদ্র মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থেকে বরাদ্দ কমিয়ে চালের পেছনে ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। তিনি বলেন, এখন আমন ধান কাটার সময়ে চালের এই আমদানি কৃষককে আরেক দফা বিপদের দিকে ঠেলে দেবে। এর প্রভাব আসন্ন বোরো মৌসুমের ওপর পড়বে।

সরকারের হাতে চাল কম
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, এবার আমনে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ লাখ টন কম চাল হয়েছে। কিন্তু তারা মনে করছে, আগামী জুন পর্যন্ত চলার মতো চাল দেশে আছে। উল্টো ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। অবশ্য বাজারে দাম বাড়ছেই। বোরো মৌসুমে সরকারিভাবে চাল সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ১৬ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে খাদ্য অধিদপ্তর আগস্টের শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পেরেছিল সাড়ে সাত লাখ টনের মতো। এরপর আমনের সংগ্রহের চেষ্টাও ব্যর্থ হতে চলেছে। সরকারি গুদামে চালের মজুত নেমেছে সাড়ে পাঁচ লাখ টনে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় অর্ধেক।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আখতার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের উচিত হবে বাজারে চালের সরবরাহ বাড়ানো। এ জন্য দেশের চালকলগুলোর কাছ থেকে চাপাচাপি করে চাল সংগ্রহ না করে সরকারের আমদানির দিকে জোর দেওয়া দরকার।

‘সাবধানে এগোতে হবে’
অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, দেশে চালের ঘাটতি আছে। বাজার দেখেই তা মনে হচ্ছে। এরই মধ্যে চীন আমদানি শুরু করায় বিশ্ববাজারে চালের দর বাড়তে শুরু করেছে। যদিও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ভারত থেকে চাল আমদানি করলে এখন প্রতি কেজি চালের দাম ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা পড়বে। পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড থেকে আনলে তা ৩৭ থেকে ৪০ টাকা পড়বে।

চাল আমদানির বিষয়ে খুব সাবধানে এগোতে হবে। কারণ, ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, আমদানি একবার শুরু হলে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়।
কে এ এস মুরশিদ,মহাপরিচালক, বিআইডিএস
বিআইডিএসের মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাল আমদানির বিষয়ে খুব সাবধানে এগোতে হবে। কারণ, ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, আমদানি একবার শুরু হলে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। আবার বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে দাম কমানোর যে উদ্দেশ্যে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলো, তা বাধাগ্রস্ত হয়। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদে পড়ে সঠিক সময় সঠিক পরিমাণ চাল আনা কঠিন হয়ে পড়ে।’