Home / অন্যায় / ছিনতাইকারীদের সঙ্গে থানার ‘সেটিং আছে’!

ছিনতাইকারীদের সঙ্গে থানার ‘সেটিং আছে’!

গাড়ির খোলা জানালা বা সিএনজির ছাদের রেক্সিন কেটে ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন কিছু নয়। রাজধানীর তিনটি পয়েন্ট  বাংলামোটর থেকে সার্ক ফোয়ারা, বিজয়সরণি থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগারগাঁও সিগ্যনাল পর্যন্ত, এই পথে প্রতিদিনই এভাবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ছিনতাইকারীদের দাবি, ব্যাগ, সোনার গহনা ও মোবাইল টান দিয়ে তারা কোন পথে পালাবে, তা ওইসব এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেমন জানেন, তেমনি পুলিশও জানে। তাদের সঙ্গে ‘থানার সেটিং আছে’। তবে তেজগাঁও, শেরে বাংলানগর ও কাফরুল থানা পুলিশ ‘সেটিংয়ের’ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বৃহস্পতিবার বিজয়সরণী সিগন্যালে কাজ করে প্রায় ১৫ জনের একটি ছিনতাইকারী দল। তাদের একজন রফিক মোল্লা।  বাংলা ট্রিবিউনকে রফিক মোল্লা বলে, ‘এখানে তেজগাঁও ও শেরে বাংলানগর থানার এলাকা মিলেছে। ছিনতাই করে রাস্তার এপার থেকে ওপারে গেলেই অন্য থানা। তখন মামলা নেবে কোন থানা। আর এখানে পালানোর অনেক রাস্তা আছে।’

কখনও গণধোলাইয়ে পড়তে হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে রফিক মোল্লা বলে, ‘আমাদের মাইর খাওয়ার প্র্যাকটিস হয়ে গেছে। আমাদের যখন মাইর দেয়, তখন ভিড়ের মধ্যে আমাদের লোক ঢুকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। তারপরও না পারলে থানায় সেটিং থাকে আমাদের।’

নির্জন এই শেরে বাংলানগরের সেকেন্ড গেটের পাশের নার্সারিগুলো ছিনতাইকারীদের ঢাল হিসেবে কাজ করে শেরে বাংলানগর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেটের কাছে থাকা স্পিড বেকারে গাড়ির ধীর গতি হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে সিএনজির ছাদ কেটে মোবাইল, হাতব্যাগ ছিনতাই করা হয়। এছাড়া বাসের খোলা জানালায় অসচেতন হয়ে কথা বললেও হারাতে হয় সেলফোনটি। এখানে রাস্তার পাশ ঘেঁষে প্রায় ১৫টি ছোট-বড় নার্সারি রয়েছে। কেউ ধাওয়া করলে ছিনতাই করা জিনিস নার্সারির গাছপালায় মধ্যে ফেলে পালায় তারা। পরে তুলে নিয়ে যায়।

এই এলাকায় মারুফ, রাসেল, সোহেলের নেতৃত্বে কাজ করে ১০-১২ জনের একটি দল। তাদের একজনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। ১৮ বছর বয়সী ওই ছিনতাইকারী হাসতে-হাসতে বলে, ‘আমরা তো এলাকাতেই থাকি। সবাই চেনে। সব সেটিংস আছে।’

কী ধরনের সেটিংস, জানতে চাইলে সে বলে, ‘আপনার কী ধারণা? এখানে কাউকে কোনও টাকা না দিয়ে আমরা কাজ করতে পারি? কখনও সেই লেনদেনে ঝামেলা হলে হাজতে নিয়ে যায়। তখন কিছু টাকা গচ্চা যায়।’৩আগারগাও সিগন্যালের ডিভাইডারে ছিনতাইয়ের জিনিস সাময়িকভাবে লুকানোর কাজে ব্যবহার হয়আগারগাঁও সিগন্যালে দু’টি ডিভাইডার দেওয়া আছে। এখানে সন্ধ্যার পর ছিনতাই করে দৌড়ে শিশু হাসপাতালের রাস্তায় যাওয়ার পথে যেকোনও জঙ্গলে ফেলে দিলেই আরেকজন সংগ্রহ করে নেয়। এই এলাকায় কাজ তদারকি করে কালাম ও রাশেদ।

রবিবার সকালে ফার্মগেট থেকে কাওরান বাজারগামী রাস্তায় হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন এক সিএনজিযাত্রী। চিৎকারে শুনে চালক পেছনে ফিরে দেখেন ছাদের রেক্সিন কাটা। ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে গেছে। চালক নিজের দরজা খুলে যাত্রীর দরজা খুলতে-খুলতে ছিনতাইকারী হাওয়া।

চালক মেহেরাব বলেন, ‘এবার নিয়ে দু’বার হলো। যাত্রীরা আমাদের অবিশ্বাস করে। কিন্তু এখানে আমাদের করার কী আছে? আমি বের হতে হতে দেখলাম ১০/১২বছরের একটি ছেলে কাওরান বাজারের ভেতর দৌড়ে চলে গেলো।’

বাংলামোটর এলাকার ছিনতাইকারী শফিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলে, ‘সার্ক ফোয়ারার ওই পাশটাতে আমাদের যাওয়া নিষেধ। বাংলামোটর থেকে সার্কফোয়ারা পর্যন্ত গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতি সিগন্যালে কিছু না কিছু পাওয়া যায়। আর ধাওয়া খেলে পান্থকুঞ্জের পেছনের ভাঙা দেয়াল দিয়ে সোজা কাঁঠালবাগান। এ এলাকার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ট্রাফিক স্যারেররা আমাদের চেনেন।’পান্থকুঞ্জের এই ভাঙা অংশ ছিনতাইকারীদের পালানোর কাজে ব্যবহৃত হয় এ প্রসঙ্গে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ রকম ঘটনা আমার এলাকায় কম।’ সুনির্দিষ্ট করে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলে তিনি বলেন, ‘মোবাইল টান দেওয়ার ঘটনা গতকাল (শনিবার) একটা ছিল, আমরা ধরে এনেছি। ওই ছিনতাইকারী মাদকাসক্ত এবং এর আগেও জেল খেটেছে।’ থানার সঙ্গে সেটিং থাকা নিয়ে ছিনতাইকারীরা দাবি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান বিষয়টি।

থানার সঙ্গে ছিনতাইকারীদের যোগসাজশের বিষয়টি অস্বীকার করে শেরে বাংলানগর থানার ওসি জিজি বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থানার সঙ্গে সেটিংয়ের প্রশ্নই ওঠে না। ওরা এক এলাকাতেও থাকে না। তবে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে না, এটা বলা যাবে না।’

কাফরুল থানার ওসি শিকদার মোহাম্মদ শামীম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এ ধরনের সমস্যা একেবারেই হয় না, তা নয়। চন্দ্রিমা উদ্যান-বিজয়সরণি-রোকেয়া সরণির থানা এলাকা ভাগাভাগির কারণে এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় ভুক্তভোগীদের। কিন্তু ছিনতাইকারীদের সঙ্গে কোনও ধরনের যোগাযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আছে, এটা ভাবার কোনও সুযোগ নেই।’

Facebook Comments