Home | অর্থনীতি | রুপালি ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা গায়েব–বিশেষজ্ঞরা বলছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত

রুপালি ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা গায়েব–বিশেষজ্ঞরা বলছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত

সিকদার শহিদুল ইসলাম নামে ১৪০০০০০৩৬৪০০৮৪৬০ নম্বর এটিএম কার্ডটি ইস্যু করা হয়েছে রূপালী ব্যাংক নিউমার্কেট শাখা থেকে। তার ব্যাংক হিসাবে জমা ছিল মাত্র ১৪ হাজার টাকা। কিন্তু সিকদার শহিদুলের অজান্তে তার ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৫০ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে উল্লেখিত অর্থ তার ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে উত্তোলন করা হয়। এভাবে এটিএম কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে রূপালী ব্যাংকের প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এত বড় আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তা উল্লেখ করা হয়নি। একটি শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি রূপালী ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনা তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। আর বিষয়টি অবহিত করতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিবকে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এ তথ্য।
এ বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন গ্রাহকের লেনদেনে এক থেকে দুই কোটি টাকা ঘাটতি থাকার বিষয়টি পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী এত বড় লেনদেনের ঘটনা সঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে এটিএম কার্ড সংক্রান্ত চুক্তি রয়েছে রূপালী ব্যাংকের। সম্প্রতি ব্র্যাক ব্যাংক অভিযোগ করেছে, রূপালী ব্যাংকের কয়েকজন হিসাবধারী বেশি লেনদেন করেছে। এতে তারা এক থেকে দুই কোটি টাকার ক্লেইম করেছে। এমডির মতে, রূপালী ব্যাংকের গ্রাহক বেশি লেনদেন করলে তার হিসাবে সেটি ডেবিট হবে। কিন্তু আমাদের ব্যাংকের গ্রাহকদের হিসাবে ডেবিট হয়নি। যে কারণে ব্র্যাক ব্যাংকের আপত্তি আমরা সঠিক মনে করছি না। তিনি আরও বলেন, ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ ঘটনা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও পাওয়া যায়নি। গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এটিএম কার্ড জালিয়াতির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গ্রাহকদের অধিকাংশের হিসাবে নামমাত্র কিছু টাকা জমা ছিল। অথচ ওই গ্রাহকের হিসাবগুলোতে এটিএম কার্ড ব্যবহার করে সর্বনিম্ন ৫০ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়, যা গ্রাহক জানেন না। সেখানে আরও বলা হয়, এটিএম কার্ড জালিয়াতির ব্যাপারে সম্প্রতি রূপালী ব্যাংক থেকে অতি গোপনে কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। অস্বাভাবিক লেনদেনের ব্যাপারে ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তবে গ্রাহকরা বলেছেন, তাদের ব্যাংক হিসাবে কখনোই ৫০ হাজার টাকার বেশি জমা হয়নি। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকার বেশি উত্তোলন করা হয়নি। ৫০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি টাকার লেনদেন বিষয়টি তারা জানেন না। এটি অস্বাভাবিক ঘটনা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একটি চক্র দীর্ঘ সময় নিয়ে রূপালী ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতির ঘটনা ঘটিয়েছে। মূলত ২০১৩ সালের জুন থেকে ২০১৫ সালের মে পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ মাস সময় নিয়ে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ চক্রও জড়িত রয়েছে। যে কারণে ব্যাংকের অর্থ লুটপাট হওয়া সত্ত্বেও ওই সময়ে ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তা উঠে আসেনি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষেরও তা নজরে আনেনি। সেখানে আরও বলা হয়, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত অনুসন্ধান করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ব্যাংকিং খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে আরও একটি ব্যাংকে এটিএম জালিয়াতির খবর ফাঁস হবে। বিষয়ে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনটি আমার কাছে এখনও আসেনি। এটিএম কার্ড জালিয়াতি প্রতিরোধে ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের এই ঘটনাটি নজরে এলে খতিয়ে দেখা হবে। এদিকে ইলেক্ট্রনিক ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিএম কার্ডের মাধ্যমে কোনোভাবেই জমার অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকরা এটিএম কার্ড ব্যবহার করে দৈনিক ৫০ হাজার টাকার বেশি উত্তোলন করতে পারেন না। ওই হিসাবে এই জালিয়াতির ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া গ্রাহকদের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক লেনদেনের হিসাব মেলানোর ক্ষেত্রে বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আসার কথা।
কিন্তু এ প্রক্রিয়াটি দু’বছর ধরে চলে এসেছে, কিন্তু ব্যাংকের অর্ধবার্ষিক বা বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ধরা না পড়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক। ব্যাংকের ভেতরের লোকজনের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এভাবে এটিএম কার্ডের মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে জমার অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নেই। যদিও যান্ত্রিক ত্রুটিতে এ ঘটনা ঘটে তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আসা স্বাভাবিক। জানা গেছে, রূপালী ব্যাংকের এটিএম কার্ড নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে একটি চুক্তি রয়েছে। ওই চুক্তির আলোকে ব্র্যাক ব্যাংকসহ রূপালী ব্যাংকের বুথ ব্যবহার করে রূপালী ব্যাংক গ্রাহকরা টাকা উত্তোলন করতে পারেন। গ্রাহকরা ওই কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন করলে রূপালী ব্যাংকের হিসাব থেকে টাকা ডেবিট হয়। এই চুক্তির আলোকে রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকরা এটিএম কার্ড ব্যবহার করছেন। তবে জানা গেছে, সম্প্রতি রূপালী ব্যাংকের কয়েকজন গ্রাহক এটিএম কার্ডের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ তুলে নেয়ার একটি অভিযোগ করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এই অভিযোগ এক থেকে দুই কোটি টাকার মতো। কিন্তু টাকা বেশি উত্তোলন করলেও রূপালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের হিসাবে কোনো ডেবিট হয়নি। এর অর্থ রূপালী ব্যাংক মনে করছে তার গ্রাহক কোনো টাকা উত্তোলন করেনি। এই হিসাবের গরমিল নিয়ে এক ধরনের চিঠি চালাচালি হচ্ছে উভয় ব্যাংকের মধ্যে।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে এটিএম কার্ডের মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের প্রাইম ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে জালিয়াত সন্দেহে জো জিয়ান হুই নামে এক চীনা নাগরিককে আটক হয়েছে। এক্ষেত্রে বিদেশী নাগরিক, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ও দেশী চক্র জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে এটিএম কার্ড জালিয়াতি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে কয়েক দফা নির্দেশ দিয়েছে। এসব নির্দেশ বাস্তবায়নের সময় বেঁধে দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করেনি। কেন বাস্তবায়ন করেনি তা জানতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠকও করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে ও বিদেশে গ্রাহকের কাছে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *