Home | অর্থনীতি | গত ৫ বছরে দেশ থেকে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার–পাচারে বাংলাদেশ সপ্তম

গত ৫ বছরে দেশ থেকে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার–পাচারে বাংলাদেশ সপ্তম

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচার প্রবণতা বেড়ে গেছে। এক বছরের ব্যবধানে টাকা পাচার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। ২০১৩ সালে দেশ থেকে অন্তত ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ৭৭ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এর আগের বছর, ২০১২ সালে পাচার হয়েছিল ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ৫৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা (প্রতি ডলার গড়ে ৮০ টাকা ধরে)। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে পাচার হয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) ‘ইলিসিট ফাইন্যান্সিয়াল ফোজ ফ্রম ডেভেলপিং কান্ট্রিজ : ২০০৪-২০১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গতকাল এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জিএফআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ দেব কার ও কনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্পানজার এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেন। এতে বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলো থেকে গত এক দশকে কী পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বাইরে গেছে, তার প্রাক্কলন করা হয়েছে।

জিএফআইয়ের নতুন হিসাবে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে অন্তত পাঁচ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা চার লাখ ৪৭ হাজার ১৬ কোটি টাকা অবৈধভাবে বাইরে চলে গেছে। এর ফলে বিশ্বের যে ১৪৯টি উন্নয়নশীল দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর হয়েছে, সে দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে সপ্তম। ২০০৩-১২ সালে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫১তম।
জিএফআই প্রকাশিত প্রতিবেদন হতে দেখা যায় যে আলোচ্য সময়কালে গড়ে প্রতি বছর ৫৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৪৪ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা অবৈধপথে বাংলাদেশের বাইরে স্থানান্তর করা হয়েছে। অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক লেনদেন, দুর্নীতি ও কর ফাঁকির মাধ্যমে এ অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে বলে জিএফআইর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অর্থ পাচারের যেসব পন্থা রয়েছে, তারই একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিস ইনভয়েসিং বা অস্বচ্ছ লেনদেন (আমদানিতে বেশি দেখানো এবং রফতানিতে কম দেখানো)। জিএফআই বলছে, ২০১৩ সালে মিস ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৮৩৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মাধ্যমে গত ১০ বছরে গেছে চার হাজার ৯১৩ কোটি ডলার।

আর হট মানি আউটফো বা ব্যালেন্স অব পেমেন্টের (নগদ আকারে) মাধ্যমে পাচার হয়েছে ১৩১ কোটি ডলার। গত ১০ বছরে গেছে ৬৪৫ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, আলোচ্য ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে ২০১৩ সালে।
ওই বছরে পাচার হয়েছে ৭৭ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা। এর আগে সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছিল ২০১২ সালে ৫৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে টাকা পাচারের পরিমাণ বেড়ে গেছে ৩৪ শতাংশ। এ দিকে ২০১১ সালে দেশ থেকে টাকা পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৪৭ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা পাচার হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ২২ শতাংশ বেশি। ২০১০ সালে টাকা পাচার হয় ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ৩০ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ বেশি। আর ২০০৯ সালে টাকা পাচার হয় ৬১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৪৯ হাজার ১৬ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন থেকে আরো দেখা যায়, ২০০৭ সাল থেকে হঠাৎ করে দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে যায়, যা আজও অব্যাহত রয়েছে। ২০০৭ সালে টাকা পাচার হয়েছিল ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ৩২ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা পাচার হয়, যা আগের বছরের চেয়ে ২১ শতাংশ বেশি। এর পরের বছরই অর্থাৎ ২০০৮ সালে টাকা পাচার হয় ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৫১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা পাচার হয়। অর্থাৎ ২০০৭ সালের চেয়ে ২০০৮ সালে টাকা পাচার বেড়ে যায় ৫৭ দশমিক ২২ শতাংশ।
জিএফআইর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৪-১৩ সময়কালে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে চীন থেকে, যার পরিমাণ এক লাখ ৩৯ হাজার ২২৮ কোটি ডলার। দ্বিতীয় স্থানে আছে রাশিয়া থেকে এক লাখ চার হাজার ৯৭৭ কোটি ডলার। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে নাম রয়েছে যথাক্রমে মেক্সিকো (৫২ হাজার ৮৪৩ কোটি ডলার) ও ভারত থেকে ৫১ হাজার ২৮ কোটি ডলার বা বাংলাদেশী টাকায় ৪০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। পঞ্চম অবস্থানে মালয়েশিয়া থেকে ৪১ হাজার ৮৫৪ কোটি ডলার। ষষ্ঠ অবস্থানে ব্রাজিল, সপ্তমে দক্ষিণ আফ্রিকা, অষ্টমে থাইল্যান্ড, নবম ইন্দোনেশিয়া এবং দশম অবস্থানে রয়েছে নাইজেরিয়া।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, মূলত পাচারকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য মন্দার কারণে ব্যবসায়ীরা দেশে তেমন কোনো বিনিয়োগ করছেন না। বিনিয়োগ করছেন বিদেশে। আর এ ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েজিং ও আন্ডার ইনভয়েজিংয়ের মাধ্যমে টাকা চলে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, টাকা পাচারের এখন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে। অনেক সময় অভিযোগ পাওয়া যায়, যে মানের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করার কথা ছিল তা হয় না অথচ উন্নত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে অতিরিক্ত অর্থ চলে যায়। আবার অনেক সময় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির কথা বলে আনা হয় অন্য পণ্য। এভাবে এখন বেশি পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে টাকা পাচারকারীরা আরো উৎসাহিত হচ্ছে। সাবেক এ গভর্নরের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত টাকা পাচার থামবে না। এটা বাড়তেই থাকবে।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *