Home / বিশেষ প্রতিবেদন / যেভাবে পালিয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের হোতারা

যেভাবে পালিয়েছিল ওয়ান ইলেভেনের হোতারা

সর্বশেষ সেনাহস্তক্ষেপের কলঙ্কিত দিন তথাকথিত এক-এগারোর ১০ বছর পূর্তি আজ। ২০০৭ সালের এই দিনে নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্রের ভিত আরো একবার দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই অবস্থা থেকে আজো বের হতে পারেনি বাংলাদেশ।
লগি-বৈঠার রাজনৈতিক সহিংসতা পরব র্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পঞ্জিকায় এই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৃষ্ট সঙ্ঘাতের সুযোগ নিয়ে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা আবির্ভূত হয় স্বরূপে। কথিত দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগে রাজনীতিকদের মুখে লেপন করা হয় কালিমা। ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নে চলে নানামুখী তৎপরতা। কিন্তু জনগণ এক বছর পেরোতে-না-পেরোতেই জেগে ওঠে। দুই বছরের মধ্যেই অবসান হয় জবরদস্তিমূলক সেই শাসনের। ক্ষমতার ইতি টেনে নিরাপদ প্রস্থানে বাধ্য হয় মঈন-ফখরুদ্দীনের সেই সরকার।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে ২০০৬ সালের শেষ কয়েক মাস আওয়ামী লীগের আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল রাজপথ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার আন্দোলন পৈশাচিকতায় রূপ নেয়। পল্টনে জামায়াতে ইসলামীর সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে প্রাণ হারান ছয়জন। এমনই এক অবস্থার মধ্যে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। কিন্তু শুরু থেকেই এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ আপত্তি তোলে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকে। ওই সময়কার ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ছিল- ৩ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও এরশাদের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা; ৭ ও ৮ জানুয়ারি অবরোধের ডাক; ৮ জানুয়ারি বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি; ৯ জানুয়ারি বঙ্গভবনের আশপাশে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা; ১০ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিরোধে শেখ হাসিনার হরতাল-অবরোধসহ ৮ দিনের কর্মসূচি।

 
এমন প্রেক্ষাপটে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যাচ্ছে অভিযোগ তুলে ১১ জানুয়ারি নির্ধারিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১১ দিন আগে আনুষ্ঠানিক সামরিক অভ্যুত্থান না হলেও সেনাবাহিনী প্রধান মইন উ আহমেদসহ শীর্ষব্যক্তিরা রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করেন। বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রপতিকে সরকারপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ এবং জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পদত্যাগ করেন উপদেষ্টা পরিষদের ১০ সদস্যের ৯ জন।
এই দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অল্প সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার লক্ষ্যে দু-এক দিনের মধ্যেই নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে কারফিউ জারি করা হয়। তবে ২৪ ঘণ্টার মাথায় ১২ জানুয়ারি কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়।
নির্বাচনপ্রক্রিয়া স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও মার্কিন পাসপোর্টধারী ড. ফখরুদ্দীনকে প্রধান করে কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গভবনের দরবার হলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নতুন প্রধান উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করান।

 
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দল ও মহাজোটের শীর্ষ নেতারা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অন্য দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ চারদলীয় জোটভুক্ত দলের নেতারা এই অনুষ্ঠান বর্জন করেন।
সেনাসমর্থিত ওই সরকার ক্ষমতা দখল করে প্রায় দুই বছর জরুরি অবস্থা জারি রেখেছিল। মইন-ফখরুদ্দীনের নামে পরিচিত ওই সরকারের ক্ষমতা দখলের লক্ষ্য ছিল- বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করা। তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকেরা। তবে ব্যবসায়ীরাও রেহাই পাননি। দুর্নীতি দমনের নামে সে সরকার ও তাদের যৌথবাহিনীর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার হন হাজারো মানুষ। লুট হয়েছে কোটি কোটি টাকা।

 
মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করার নামে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের দিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে। সেই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে ‘দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ শুরুতে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে নিলেও পরে দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের হেয় করে রাজনীতিশূন্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে কুশীলবদের উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার প্রবণতা জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দুই দলের ৭৯ জন ভিআইপি রাজনীতিবিদকে বহু মামলায় জড়িয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাকহোলে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের পর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নই ছিল তাদের লক্ষ্য।

 
২০০৭ সালের ৭ মার্চ গভীর রাতে যৌথবাহিনীর সদস্যরা ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও পরে ২ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগারে বন্দী রাখা হয়। কিন্তু এর আগেই শীর্ষ এই দুই নেত্রীকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। পরে নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব থেকে তাদের বাদ দেয়ার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে প্রধান দুই দলে তথাকথিত সংস্কারের চেষ্টা চালানো হয়। এই সংস্কার করা না গেলেও দলগুলোতে সীমিত আকারে ভাঙন সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। দুই নেত্রীকে বিচারের আগেই কারাবন্দী করে রাখার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

 
শুরুর দিকে দেশী-বিদেশী কিছু মহল এক-এগারোর সরকারের প্রতি সমর্থন জানালেও, তাদেরও মোহ ভাঙতে শুরু করে বছর না ঘুরতেই। বাজারে আগুন লাগে। ১৭-১৮ টাকা কেজির মোটা চাল ৪০-৪৫ টাকায় গিয়ে ঠেকে। দ্বিগুণ হয়ে যায় ভোজ্যতেল, গুঁড়োদুধসহ বহু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি হয় আকাশছোঁয়া। বন্ধ হয়ে যায় অনেক মিল-কল-কারখানা, স্থবির হয়ে পড়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। স্তব্ধ হয়ে পড়ার উপক্রম হয় অর্থনীতির চাকা। বিনিয়োগে ধস নামে।
দ্রব্যমূল্যের পাশাপাশি সার নিয়ে সঙ্কট, প্রতিষ্ঠিত অনেক ব্যবসায়ীকে ঢালাওভাবে অপরাধী সাব্যস্ত করে আটক, নির্যাতন এমনকি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে মোটা দাগের অর্থ আদায়সহ বহু বিতর্কিত পদক্ষেপের কারণে তাদের প্রতি জনগণের অনাস্থা সৃষ্টি হয়। দায়িত্ব নিয়েই মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তছনছ করে দেয়। এ রকম অরাজক পরিস্থিতির কারণে জনগণই বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলোও সেনাসমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আসে। একপর্যায়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য হন তারা।

 
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পরেও সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল মইন উ আহমেদ, যাকে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হোতা হিসেবে অভিহিত করা হয়।
‘এক-এগারো’র আরেক কুশীলব ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। সন্ত্রাস ও গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত ‘জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। তখন তিনি ছিলেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি। এরপরই তিনি হন সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও)। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে মহাজোট সরকারের অধীনে তিনি পররাষ্ট্র বিভাগের চাকরিতে বহাল থেকেছেন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার পদে ২০১৪ সালের মে মাস পর্যন্ত। এ জন্য তার চুক্তিভিত্তিক চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয় চারবার। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশেই আছেন। তেজগাঁওয়ে পিকাসো নামে একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবসা করছেন তিনি।
আরেক কুশীলব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। প্রথমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে পিৎজা ডেলিভারির কাজ করতেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিৎজা পৌঁছে দিতেন তিনি। পরে একটি ওষুধ কোম্পানিতে প্রতিনিধির চাকরি নেন। তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কুশীলবদের মধ্যে কেউ দেশে আছেন, কেউ চলে গেছেন বিদেশে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংসদে বারবার এক-এগারোর কুশীলবদের বিচারের দাবি উঠলেও বিচার হয়নি। সেই দাবি আজ অনেকটাই ম্রিয়মাণ।

 
পরবর্তীতে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২০০৭ সালের আগস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত সহিংস ঘটনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমদ, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী ও কর্নেল শামসুল আলমকে দায়ী করে প্রতিবেদন উত্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনায় দায়ীদের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে বিচারের সুপারিশ করা হয়।

 
জাতীয় সংসদের অধিবেশনের সপ্তম কার্যদিবসে শিক্ষামন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক উত্থাপিত বিশেষ প্রতিবেদনে এ সুপারিশ করা হয়। কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সংসদে প্রতিবেদন উত্থাপন করেন।
প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটির সুপারিশে বলা হয়, কমিটি মনে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত সহিংস ঘটনায় ছাত্র- শিক্ষকদের উপর যে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে তার জন্য ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও জেনারেল মইন উ আহমেদ, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলুল বারী ও কর্নেল শামসুল আলম প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দায়ী। ভবিষ্যতে এ জাতীয় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে না হয় সে জন্য দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
তদন্ত কমিটি একইভাবে যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক নুর মোহাম্মদের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে।

 
প্রতিবেদনে কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ডিজিএফআইয়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে অনাকাঙ্খিত এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ডিজিএফআই তার দায়িত্ব বহির্ভূত কাজ করেছে। ঘটনায় পুলিশ ও র‌্যাবের বাড়াবাড়িও লক্ষ্যণীয়। ওই ঘটনায় ডিজিএফআই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে। সিভিল প্রশাসনকে উপেক্ষা করে ডিজিএফআই যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে তা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করা যায়। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসাবে ছাত্ররা সেদিনের ঘটনায় বিক্ষোভ করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনায় নির্যাতিত ছাত্র-শিক্ষকদের মামলা প্রত্যাহার ও দণ্ড মওকুফ না করায় তাদের অনেকের চাকরি ও বিদেশ গমনে ভিসা প্রাপ্তিতে সমস্যা হচ্ছে। তাদের দণ্ড মওকুফে সরকারিভাবে আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে ঘটনায় নির্যাতিতদের সরকারিভাবে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো সেনা ক্যাম্প স্থাপন করতে হলে সিন্ডিকেটের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত রিকসা চালকের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান, স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে অনিবার্য প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর সংস্কৃতি বন্ধ করা, মামলা প্রত্যাহার হলেও ভবিষ্যতে হয়রানি আশংকা রুখে দেয়া, ৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্ত্বশাসন আইন যুগোপযোগী করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দক্ষ প্রক্টোরিয়াল বডি গঠন, বেসামরকি বিষয়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিজিএফআই) এর হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, টিএফআই ও যৌথ বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ সেল বন্ধ, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া ও যে কোনো বিষয়ে জাতীয় সংসদের কাছে জবাবদিহি করতে সবাইকে বাধ্য করার সুপারিশ করা হয়।

 
সাব-কমিটি ঘটনা সংশ্লিষ্ট সব তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত ৩৮৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ঘটনার পেছনের কারণ হিসাবে ১১টি পর্যবেক্ষণ ও ১৩টি সুপারিশ আনা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ, প্রধান উপদেষ্টা ড.ফখরুদ্দীন আহমদের মতামত, মইন উ আহমেদের লিখিত বক্তব্য ও টেলিকনফারেন্স, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার, আটক ও নির্যাতিত শিক্ষার্থী- শিক্ষক ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের বক্তব্য, সেই সময়ে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারী বিভিন্ন বৈঠক, সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা, ছাত্র-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা বিষয়ে তথ্য এবং ভিডিও ফুটেজের একটি সিডি প্রতিবেদনের সঙ্গে দেয়া হয়।
রাশেদ খান মেনকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নাহিদ, মির্জা আজম, বীরেন শিকদার, শেখ আব্দল ওহাব, মো. শাহ আলম, মু. জিয়াউর রহমান, কাজী ফারুক কাদেরকে সদস্য করে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়। ৮ জুলাই ২০০৯ সালে একই সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে মওদুদ আহমেদ ও মমতাজ বেগমকে যোগ করে এ কমিটি পুনর্গঠন করা করা হয়।

 
সংঘটিত ঘটনার বিবরণে বলা হয়, ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট একটি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে মূলত এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সেদিন বিকেলে চারটার সময় বৈরি আবহাওয়ার মধ্যে আন্তঃবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্টে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সঙ্গে লোক প্রশাসন বিভাগের খেলা চলছিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে লোক প্রশাসন বিভাগের ছাত্র মেহেদী মোহাম্মদ ছাতা মাথায় দিয়ে খেলা দেখছিল। নিজ বিভাগের খেলা হওয়ায় খেলার উত্তেজনা সম্পর্কে উৎসাহের ঘাটতি ছিল না তার। এ সময় তার পেছনে খেলা দেখছিল মোস্তফা কামালসহ বেশ কয়েকজন সেনা সদস্য। খেলায় বুদ থাকা মেহেদী মোহাম্মদের স্বভাবতই খেয়াল ছিল না পেছনে কে খেলা দেখছে। খেলার শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তে পেছনে বসে থাকা সেনা সদস্য মোস্তফা কামাল মেহেদী মোহাম্মদকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়ে ছাতা সরিয়ে নিতে বলেন। এক পর্যায়ে ঘটনা হাতাহাতিতে গড়ায়।

 
এ নিয়ে উত্তেজনার এক পর্যায়ে খেলা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ঘটনাস্থলে আসেন। তারা ওই সেনা ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুরুল হুদার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তঃবিভাগ ফুটবল টুর্নামেন্টের আহবায়ক ড. সিরাজুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ও লে. কর্নেল নুরুল হুদা সেনা সদস্যদের পক্ষে দুঃখ প্রকাশ করেন। এতে পরিস্থিতি কিছুটা প্রশমিত হয়। পরে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই কয়েকজন সেনা সদস্য গ্যালারির উপর থেকে ভিডিওচিত্র ধারণ করা শুরু করলে ঘটনা ক্রমান্বয়ে বড় আকার ধারণ করে।
প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘প্রতিবেদনটি প্রস্তুতকালে কোনো ধরনের আবেগকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা এড়ানোর জন্য প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। আইন প্রণয়নে প্রতিবেদনে যে সুপারিশ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা গেলে জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।’

 
তিনি আরো বলেন, ‘জাতীয় জীবনে এটি একটি কলংকজনক ঘটনা। আগামীতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে না কামনা করি। স্থায়ী কমিটি আশা করি সুপারিশই গ্রহণ করবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নে কাজ করবে।’
এছাড়াও দুই বছরে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়েও বিচার করার ঘোষণা দিয়েছিল মহাজোট সরকারের মন্ত্রীরা। কিন্তু ১০ বছর পরও সেসব কথার ফুলঝুড়ির বাস্তবায়ন নেই। বরং কুশিলবদের বিদেশে পাড়ি জমানো এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করেছে তারা। ফলে এ নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েই গেছে।
বিচারের জন্য দাবির জবাবে নবম সংসদের অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে শেখ হাসিনা বিরোধী দলের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনদের বিচার চাইলে আদালতে মামলা করেন না কেন? আদালত এখন স্বাধীন। বিচার চাইলে মামলা করেন। আমাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন কেন? প্রধানমন্ত্রীর এ পাল্টা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে আরো একবার পরিষ্কার হয়, দুই প্রধান উদ্দিনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে না। সে কথাটাই একটু ঘুরিয়ে বলতে গিয়ে কৌতূহলের সৃষ্টি করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

Facebook Comments