Home / বিশেষ প্রতিবেদন / যে পাঁচ ধাপে চলে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণা

যে পাঁচ ধাপে চলে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণা

ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দেশের অসহায় মানুষদের বিদেশে পাঠাচ্ছে একটি প্রতারক চক্র। নির্ধারিত দেশে পৌঁছার পর অপহরণ করা হচ্ছে তাদের। অমানুষিক নির্যাতনের পর দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের মুক্তিপণ। বছরের পর বছর ধরে এই পুরো জালিয়াতি সংগঠিত হচ্ছে দেশ ও দেশের বাইরে থাকা কয়েকটি মানবপাচার ও জিম্মি চক্রের মাধ্যমে। গ্রামের সহজ-সরল সাধারণ মানুষদের সঙ্গে প্রতারণার ফাঁদটিতে রয়েছে পাঁচটি ধাপ। প্রতিটি ধাপেই রয়েছে মানবপাচার ও জিম্মি চক্রের সদস্যরা।

চক্রগুলো প্রথম ধাপে স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে বিদেশে যেতে আগ্রহীদের সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় ধাপে জাল পাসপোর্ট-ভিসা প্রস্তুত করা হয়। তৃতীয় ধাপে বাংলাদেশ থেকে আকাশ বা নৌপথে বিদেশের পথে পাড়ি দেওয়া হয়। চতুর্থ ধাপে নির্ধারিত দেশে পৌঁছার পর ঐ দেশে অবস্থানরত বাঙালী ও স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের জিম্মি বা অপহরণ করা হয়। পঞ্চম ধাপে অপহৃতদের নির্যাতন করে সেই খবর দেশে থাকা স্বজনদের কাছে পৌঁছে বিনিময়ে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।

বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও জিম্মিকারী চক্রের ১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৩। এসময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ভিসা, দেশি-বিদেশি পাসপোর্ট ও ভিসা-পাসপোর্ট তৈরির সরঞ্জামসহ নগদ প্রায় ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে লিবিয়ায় চার জন ও দেশের ভেতরে দুজন অপহৃতকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল আনোয়ার জানান, এই মানবপাচার চক্রটির জনশক্তি রপ্তানির বৈধ কোনও কাগজপত্র নেই। তারা ২০০৭ সাল থেকে অবৈধভাবে প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবপাচার করে আসছে। এই চক্রটি অবৈধভাবে বিমান, স্থল ও নৌপথের মাধ্যমে ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, কানাডা, বলিভিয়া, মোজাম্বিক, নিউজিল্যান্ডে মানবপাচার করে আসছিলো।

মূলত স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা গ্রামের সাধারণ মানুষদের ‘টার্গেট’ করে চক্রটির সদস্যরা প্রতারণা করে আসছিলো। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া ঢাকার সবুজবাগের জামান জালালী এই চক্রের মূলহোতা। সে এসএসসি পাশের পর জর্ডানে গিয়েছিলো। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় দুই বছর পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

দেশে ফেরার পর জামান বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ এজেন্সিতে বিদেশেগামীদের টিকিট কেনা, পাসপোর্ট তৈরি ইত্যাদি কাজের সঙ্গে জড়িত হয়। তখনই মাদারীপুরের রমজান আলী নামের এক দালালের সঙ্গে পরিচয় হয় জামানের। তারা দুজনে মিলে এ ধরনের প্রতারণা চক্র তৈরির পরিকল্পনা করে। এই কাজে যারা আগে থেকেই পারদর্শী ও অভিজ্ঞ, তাদেরকেও সঙ্গে নেয় জামান ও রমজান।

এই চক্রের স্থানীয় এজেন্টরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষদের অল্প খরচে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করতো। সহজে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিতো সাধারণ মানুষ।

মালয়েশিয়া, লিবিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডের জন্য ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা এবং ইউরোপ বা আমেরিকার জন্য জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করতো এজেন্টরা। এক্ষেত্রে প্রতিটি কাজের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা করে এজেন্টরা পেতেন বলে জানায় র‌্যাব।

পাসপোর্ট তৈরি, ভিসা করা, টিকিট ক্রয়ের কথা বলে বিভিন্ন ধাপে বিদেশে যেতে আগ্রহীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো। প্রথম ধাপে টাকা দেওয়ার পর জামান ও রমজান প্রয়োজনীয় ভুয়া পাসপোর্ট, ভিসাসহ অন্যান্য কাগজ তৈরি করতো।

প্রতারণা চক্রটির সদস্য হাসান গ্রাফিক্স বিষয়ে কোর্স করায় দক্ষতার সঙ্গে নকল পাসপোর্ট তৈরি করতে পারতো। তারা নিজেরাই ভুয়া ভিসা তৈরি করে বিদেশে যেতে আগ্রহীদের পাঠাতো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারা মালয়েশিয়া, কানাডা, চীন, বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনও দেশের ইমিগ্রেশন সিল ব্যবহার করে পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতো, যাতে ইমিগ্রেশন কর্মীদের কোনও সন্দেহ না হয়।

র‌্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান জানান, উন্নত দেশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে যেতে ইচ্ছুকদের অন্য একটি দেশে নিয়ে যেতো প্রথমে। এরপর আগে থেকেই তৈরি করা সংশ্লিষ্ট দেশটির পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাদের উন্নত দেশটিতে সহজেই পৌঁছে দিতো। এছাড়া পুলিশ ভেরিফিকেশন ফরমগুলো বিদেশের কর্মস্থলে প্রদর্শনের জন্য সরবরাহ করা হতো।

একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ সনদ, ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি তৈরি করতো এই প্রতারক চক্র। নকল পাসপোর্ট, ভুয়া ভিসা, ভুয়া টিকিটের কারণে অনেক নিরীহ ব্যক্তিকে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে আসতে হতো বলেও জানান মুফতি মাহমুদ খান।

র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার মানবপাচার ও জিম্মিকারী চক্রের সদস্যরা

গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক(অপারেশন) কর্নেল আনোয়ার জানান, চক্রটির জামান, রমজান ও ফখরুল প্রার্থীদের টিকিট ক্রয় ও বিমানবন্দর অতিক্রম করানোর কাজটি করতো। এছাড়া জামান ও রমজান টেকনাফ-কক্সবাজারের বিভিন্ন এজেন্টদের মাধ্যমে সমুদ্রপথেও বিদেশে লোক পাঠাতো। এই চক্রটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে যুক্ত।

এদের মধ্যে বাংলাদেশে ছুটিতে আসা লিবিয়া প্রবাসী হানিফের মাধ্যমে জামান ও রমজান মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করতো। এছাড়া অন্যান্য দেশের জন্য তাদের আরও অনেক এজেন্ট রয়েছে। বিদেশি এজেন্টরা ঐ দেশে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করিয়ে দিতো। উন্নত দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে তাদের বিদেশি প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো। বিদেশি চক্রের কাছে হস্তান্তর করার পর প্রতারণার শিকার হওয়া সাধারণ মানুষ বন-জঙ্গল, সাগর ইত্যাদি পথে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করতো।

এরপর শুরু হতো তাদের আরেক পর্ব। কিছুদিন সেদেশে অবস্থান করার পর তাদের স্থানীয় পুলিশের পরিচয় দিয়ে অপহরণ করতো এই প্রতারক ও জিম্মি চক্র। অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো নিরীহ মানুষগুলোর ওপর। সেই নির্যাতনের খবর পৌঁছে দেওয়া হতো দেশে থাকা স্বজনদের কাছে। বিনিময়ে দাবি করা হতো মোটা অংকের মুক্তিপণ। পরিবার রাজি হলে সেই টাকা দেশে অবস্থান করা চক্রের সদস্যরা গ্রহণ করতো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে নির্যাতন করে মেরে ফেলার ঘটনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

এভাবেই গত ২৬ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় জিম্মি হন ভোলার মো. মাহবুব আলম। তাকে মালয়েশিয়ান পুলিশের পরিচয় ‍দিয়ে তুলে নেওয়া হয়। চরম নির্যাতনের পর বাংলাদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের কাছে ‍মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অপহরণকারীদের কথামতো টাকা তুলে দেন স্বজনরা। তবে কিছু টাকা দেয়ার পরও মাহবুবকে ছেড়ে না দেওয়ায় বাংলাদেশে র‌্যাবের সহায়তা চায় মাহবুবের পরিবার। র‌্যাব পরবর্তীতে মালয়েশিয়ান দূতাবাস, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় মালয়েশিয়া থেকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মাহবুবকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনে।

ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে মাহবুব বলেন, জঙ্গলের মধ্যে হাত-পা বেঁধে বুক সমান পানিতে নামিয়ে রাখে সারারাত। বৃষ্টির পানি মুখে পড়ছে। দম নিতে পারছিলাম না। হাত-ও বাঁধা, পা-ও বাঁধা। না পারছিলাম মুখ থেইক্যা পানি মুছতে, না পারছিলাম উপরে উঠতে। একেকটা সেকেন্ড যায়, মনে হয় মইরা যাইতেছি।

দেশে-বিদেশে এমন আরও বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করছেন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক(অপারেশন) কর্নেল আনোয়ার। তিনি বলেন, র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে মানবপাচার রোধে ১৫২টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে মানবপাচারকারী চক্রের ৪৩২ জন সদস্যকে গ্রেফতারের পাশাপাশি ৬৯৬ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব। কয়েকটি মানবপাচার ও জিম্মি চক্র এখনও সক্রিয় রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Facebook Comments
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.