Breaking News
Home / বিশেষ প্রতিবেদন / ‘তারা আমার স্বামীরে পুড়ায় নাই, আমার সংসারটা পুড়াইছে’

‘তারা আমার স্বামীরে পুড়ায় নাই, আমার সংসারটা পুড়াইছে’

রাজনীতি যারা করে তাগো দায়িত্ব হইলো জনগণরে নিরাপত্তা দেওয়া, জনগণরে ভালো রাখা। আর এখন রাজনীতির কারণে আমার এই অবস্থা’, বলছিলেন পেট্রোলবোমায় দগ্ধ সালাউদ্দিন। একটু থেমে আবার বলেন, ‘আমি তাগো খালি একটা কথা জিজ্ঞাস করতে চাই, আপনেরা কাগো জন্যে রাজনীতি করেন?’ নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার পাঁচরুখী গ্রাম। এই গ্রামের সালাউদ্দিন চাকরি করতেন ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে পোশাকের দোকানে। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ভালোই যাচ্ছিল দিন। ২০১৫ সালের ২৩ জানুয়ারি পাল্টে দিল সালাউদ্দিনের জীবন। সে সময় বিএনপির ডাকা অবরোধ চলছিল সারাদেশে। অবরোধ চলাকালে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জগামী বাসে ছোড়া পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হন সালাউদ্দিন। শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াসহ শরীরের ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল তার।

মঙ্গলবার বিকেলে পাঁচরুখী গ্রামে সালাউদ্দিনের নিজ বাড়িতে তার সঙ্গে পরিবর্তন ডটকমের এই প্রতিবেদকের কথা হয়। সে সময়ের স্মৃতি বলতে গিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন তিনি। বলেন, ‘শরীরে আগুন নিয়া রাস্তায় দৌড়াইছি, কে যে আমারে ঢাকা মেডিকেলে নিছে কইতে পারুম না। ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায় আরো কত মানুষ, খালি চিৎকুর আর চিৎকুর। আমার পরিবার আমারে খোঁজে। আমি তাগো সামনে শুইয়া কাতরাইতাছি, কিন্তু আমার মুখ এমন পুইড়া গেছে যে তারা আমারে চিনতে পারতেছে না। আমিও যন্ত্রণায় কইতে পারি না।’

কথা বলতে বলতে স্মৃতির ভয়াবহতায় এখনো আঁতকে উঠেন সালাউদ্দিন। বলেন, ‘একটা সময় আমার মায়ের কান্দা দেইখা আর সইতে না পাইরা চিৎকার কইরা কইলাম, মা গো আমি তোমার সালাউদ্দিন।’সেই ঘটনার পর সালাউদ্দিনের মুখ ও হাতের গড়ন বদলে গেছে। প্রায় দুই বছর হতে চললো দগদগে ঘা শুকিয়ে গেলেও আগের মতো আর স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না তিনি। জামা-কাপড় গায়ে দেওয়া, খাওয়া-দাওয়া ও প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য স্ত্রী-সন্তানের ওপর নির্ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে জীবন। ঠোঁটের গড়ন পরিবর্তন হওয়ায় পুরোপুরি হা করতে পারেন না, খাবার খেতে হয় মুখের সামান্য ফুটো দিয়ে ধীরে ধীরে অনেক সময় নিয়ে, অনেকটা তার মুখ দিয়ে গুঁজে দেওয়ার মতো খাবার তুলে দেন স্ত্রী-সন্তান।

তার চাইতেও বড় কষ্ট আছে সালাউদ্দিনের। নিজে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থেকে বা কোনো অপরাধ না করেও যখন নোংরা রাজনীতির বীভৎস শিকার হয়ে কাতরাচ্ছেন, তখন সমাজের তিরস্কার, অবহেলা, এড়িয়ে চলার সামাজিক বঞ্চনা আরও কুঁকড়ে মারছে সালাউদ্দিনকে। সমাজে স্বাভাবিকভাবে মিশতে পারেন না তিনি।বললেন, ‘ঘর থেকা বাইর হইলে মানুষ নানান কথা কয়। রাস্তা দিয়া হাঁটার সময় ছোট বাচ্চাও আমারে দেখলে ভয় পাইয়া কাইন্দা দেয়, তহন অনেক খারাপ লাগে।’

গণ-পরিবহনে চলতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় সালাউদ্দিনকে। এখন অনেক বাসেই তাকে উঠতে দিতে চায় না ড্রাইভার-কন্ট্রাক্টররা। ঢাকায় ডাক্তার দেখাতে আসা-যাওয়ায় সমস্যায় পড়েন তিনি। এখনো কোনোভাবে কাকুতি মিনতি করে বাসে উঠলেও তার পাশে কেউ বসতে চায় না।

চলাফেরা স্বাভাবিক হলেও হাতের আঙুল বেঁকে যাওয়ায় তিনি কিছু ধরতে পারেন না, তাই সালাউদ্দিনকে কেউ কোনো কাজে রাখতে চায় না। আগে পোশাকের দোকানে চাকরি করলেও মুখের স্বাভাবিক গড়ন বদলের ফলে ওই পেশায়ও ফেরার সুযোগ নেই তার।

সালাউদ্দিনের স্ত্রী উর্মী বেগম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘তারা তো আমার স্বামীরে পুড়ায় নাই, আমার সংসারটা পুড়ায়া দিছে।’প্রতি মাসে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের অনুদান হিসাবে ৯ হাজার ২০০ টাকা পান সালাউদ্দিন। নিজের ওষুধ কিনতেই লেগে যায় চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বাকি টাকায় চারজনের সংসারের খাবারের জোগান হয় না। দুই ছেলে হাসিব ও আবিদ অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

উর্মী বেগম বলেন, ‘সন্তানদের জামাকাপড় দিতে পারি না, মানুষের পুরান কাপড় চাইয়া আনি। স্কুলে আবেদন কইরা বেতন মাফ করাইছি, কিন্তু খাতা কলম এগুলা দিতে পারি না। আমার সংসার আগে এই রকম ছিল না। ছেলেদের প্রাইভেট মাস্টার রাইখা পড়াইতাম, আর এখন সব বন্ধ।’

‘জাগো কারণে আমার জীবন আজ এই রকম তারা তো খোঁজই রাখে না’, ক্ষোভ ঝড়ে সালাউদ্দিনের কণ্ঠে।

পরিবর্তন ডটকমকে তিনি বলেন, ‘এলাকার এমপি, চেয়ারম্যান-কমিশনার, বিএনপির নেতারা কেউ কখনো খোঁজ নেয় নাই। কোনো সাহায্যও করে নাই। এমপি সাব প্রথমদিকে সাহায্য করার কথা দিছিলো, এরপর কতবার তার কাছে গেছি কিন্তু কিছুই করলো না।’

সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না। তারা আন্দোলন করে, রাজনীতি করে কি মানুষ মারণের লাইগা? আমি সাধারণ মানুষ, নিজে কাজ কইরা খাইতাম। আমরা তো সরকারের কাছে, বিরোধী দলের কাছে কোনোদিন সাহায্যের জন্য হাত পাতি নাই। দেশে সরকার থাকবো, বিরোধী দল থাকবো মানুষের ভালোর লাইগা, আমরা যেন দেশের মধ্যে নিরাপদে থাকতে পারি। কিন্তু তারা এইসব ভাবে না।’

‘এখন আমি বাঁইচা থাইক্যাও মইরা আছি’ বলে কাঁদতে থাকেন সালাউদ্দিন।ফেরার সময় পরিবর্তনের এই প্রতিবেদককে এগিয়ে দিতে রাস্তায় আসেন সালাউদ্দিন। এ সময় তাকে দেখে এলাকার এক সিএনজি অটোরিকশাচালক বলেন, ‘এই তুমি এখানে আসছো ক্যান, যাও বাড়িত যাও’। সালাউদ্দিন তখন বলেন, ‘দেখছেন এইভাবে বাঁইচা আছি।’

এক বছর আগে সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে সালাউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয় তার বাড়িতে। তখনও পোড়া ঘা শুকায়নি তার। ক্ষত থেকে পানি ও পুঁজ ঝরছিল হাতের আঙুলগুলো জোড়া লেগে ছিল। তখনও সংসারের অভাব-অনটন, অনুদানের সবটা টাকা ওষুধের পেছনেই ব্যয় হতো। এক বছর পর শুধু শরীরের ক্ষতটাই শুকিয়েছে; কিন্তু জীবন সংগ্রামের কিছুই পরিবর্তন হয়নি। মাঝখানে শুধু আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় ও নিজের জমানো টাকা ভেঙে দুই আঙুলের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন, কিন্তু দুই হাতের আরো ছয় আঙুল এখনো বাঁকা ও জোড়া লেগে আছে। অস্ত্রোপচার করার অর্থের জোগান নেই সালাউদ্দিনের। মুখ, চোখের এবং নাকের আরও কিছু অপারেশন করা দরকার, জানালেন সালাউদ্দিন।

২০১৫ সালে ৫ জানুয়ারি বিএনপি বর্তমান সরকারের এক বছর পূর্তির সময় সরকারবিরোধী আন্দোলন চালায়। সেই সময় দেশের নানা স্থানে অবরোধ চলাকালে যানবাহনে পেট্রোলবোমা ছোড়া হয়। প্রায় চার মাস স্থায়ী ছিল এই আন্দোলন। সেই পেট্রোলবোমা নির্ভর আন্দোলনে আগুনে পোড়া শতশত মানুষের করুণ দিন যাপনের যেন এক ভয়ঙ্কর উদাহরণ হয়ে জীবন নিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম ঢাকার অদূরের পাঁচরুখী গ্রামের সালাউদ্দিন। সুত্র:  poriborton 

Facebook Comments