স্কুল নির্মাণে রডের পরিবর্তে কঞ্চি, ভেঙে পড়লো পিলার

73

বরগুনার আমতলীর বৈঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওয়াশ ব্লক (টয়লেট) নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি (টুনি) ব্যবহার করা হয়েছে। এতে নির্মাণের তিন বছরের মাথায় ওয়াশ ব্লক ভেঙে পড়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় গত শনিবারের ওই দুর্ঘটনার হাত থেকে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা রক্ষা পেলেও রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণকারী ঠিকাদারকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমতলী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বৈঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালে দরপত্র আহ্বান করে। ৭ লাখ টাকা ব্যয়ের ওই কাজ পান আমতলী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক ঠিকাদার নুর জামাল। নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। কাজের শুরুতে বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ এতে বাধা দিলেও তা উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদার নুর জামাল তার কাজ চালিয়ে যান। তার ভয়ে বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ কাজ দেখভাল করতে পারেনি। তৎকালীন উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগসাজশে ঠিকাদার নিজের ইচ্ছামাফিক রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

২০১৭ সালে ওই কাজ শেষ হলে তখন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতানা রাজিয়ার কাছে প্রত্যায়নপত্র চান ঠিকাদার। কিন্তু কাজের মান ভালো না হওয়ায় প্রত্যয়নপত্র দেননি এমন দাবি প্রধান শিক্ষকের। এদিকে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের তিন বছরের মাথায় লেন্টিন ও ওয়ালে ফাটল ধরে। ওই ফাটল মেরামতের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য এ বছর ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। গত শনিবার ওই ওয়াশ ব্লক মেরামতের কাজ শুরু করে বিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। রাজমিস্ত্রি সুলতান হাওলাদার কাজ শুরু করতেই মুহূর্তের মধ্যে ওয়াশ ব্লকের লেন্টিন ও ওয়াল ভেঙে পড়ে। এরপরই লেন্টিন থেকে বেরিয়ে আসে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি।

তাৎক্ষণিক রাজমিস্ত্রি সুলতান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও এলাকাবাসীকে বিষয়টি জানান। প্রধান শিক্ষক ঘটনাস্থলে এসে ভেঙে পড়া অংশে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি দেখে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মজিবুর রহমানকে বিষয়টি জানান। এরপর গত রবিবার বিকেলে মজিবুর রহমান বিদ্যালয়ে এসে ভেঙে পড়া ওয়াশ ব্লক পরিদর্শন করেন। এদিকে খবর পেয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম ও ঠিকাদার নুর জামাল ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাঙা ওয়াশ ব্লক থেকে বাঁশের কঞ্চির লেন্টিন ও কঞ্চি সরিয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ করেছে এলাকাবাসী। এ সময় তারা এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়েন।

স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ খান, দেলোয়ার হোসেন ও এনামুল খান বলেন, ঠিকাদার নুর জামাল রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করেছে। ঠিকাদারের বিচার দাবিও করেন তারা।

বিদ্যালয়ের দপ্তরি মো. শাওন খলিফা বলেন, ‘প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম ও ঠিকাদার নুর জামাল এসে বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করা ভেঙে পড়া লেন্টিন সরিয়ে ফেলেছে। আমি নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা শোনেনি। পরে গোপনে আমি ভাঙা লেন্টিনের দুটি টুকরো লুকিয়ে রাখি।’

রাজমিস্ত্রি সুলতান হাওলাদার বলেন, ‘মেরামতের কাজ শুরু করা মাত্রই ওয়াশ ব্লকের লেন্টিন ও ওয়াল ভেঙে পড়ে। পরে দেখতে পাই লেন্টিনের মধ্যে বাঁশের কঞ্চি। ধারণা করা হচ্ছে পুরো ওয়াশ ব্লকে রডের পরিবর্তে বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করা হয়েছে।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতানা রাজিয়া বলেন, ‘ঠিকাদার নুর জামাল ওয়াশ ব্লকের কাজের শুরুতেই নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ করেন। ওই সময় আমি নিষেধ করলে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। আমি তার কাজের কোনো প্রত্যয়ন দিইনি। এখন দেখছি রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়েছে।’

তবে ঠিকাদার নুর জামাল রডের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘আমাকে ফাঁসানোর জন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’

আমতলী উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। তদন্তসাপেক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা পারভীন বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Loading...