Breaking News
Home / ভারত / বাংলাদেশী পণ্যের ওপর ভারতের শাস্তিমূলক কর আরোপ

বাংলাদেশী পণ্যের ওপর ভারতের শাস্তিমূলক কর আরোপ

ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৈষম্য ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। বৈষম্য কমিয়ে বাণিজ্যকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে বাংলাদেশের তরফ থেকে তাগিদ থাকলেও ভারতের অবস্থান বরং বিপরীত। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশী পণ্য আমদানী করলেও বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানী হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ডলারের পণ্য। এর মধ্যে কাঁচাপাটের মত ট্রাডিশনাল পণ্যের অবদান অর্ধেকের বেশী।

আন্তর্জাতিক বাজার ও উৎপাদন সক্ষমতা হারিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ভারতে অনেকগুলো বড় পাটকল গড়ে উঠেছে এবং পাটের আন্তর্জাতিক বাজারও এখন ভারতের হাতে। বাংলাদেশের পাটশিল্প তার আন্তর্জাতিক বাজার ও ঐতিহ্য হারানোর সুযোগ গ্রহণ করেছে ভারত। সেই সাথে বাংলাদেশের কাঁচাপাট, পাটের সুতা এবং পাটজাত পণ্যের অন্যতম ক্রেতাও ভারত।

আমাদের ভারত-নির্ভর পাটশিল্প আবারো বড় ধরনের ধাক্কা খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে বসেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য-বৈষম্য ইত্যাদি বিষয়গুলো বাদ দিলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কনভেনশন ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম-নীতি লঙ্ঘন করে, কোন নির্দেশনা ছাড়াই হঠাৎ করে ভারত বাংলাদেশের পাটপণ্যের উপর উচ্চ হারের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে দেশের পাটশিল্প এবং পাটচাষীদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এক ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য। বাংলাদেশ ও ভারত ডব্লিউটিও’র সদস্য রাষ্ট্র হওয়ায় যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ভারতের জন্য বৈধ নয়, শোভনীয়ও নয়।
বাংলাদেশ যখন পাট ও পাটজাতপণ্যের মত ট্রাডিশনাল পণ্যের পাশাপাশি গার্মেন্ট, ওষুধশিল্পের  উপর ভিত্তি করে পশ্চিমা বিশ্বে এবং বাণিজ্য-অংশীদার দেশগুলোতে বছরে হাজার হাজার কোটি ডলারের পণ্য রফতানী করে একটি রফতানী নির্ভর অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে চাইছে, তখন ভারত বাংলাদেশকে শুধু তাদের পণ্যের বাজার হিসেবেই দেখতে আগ্রহী।

এভাবেই গত ১০ বছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি আগের চেয়ে চারগুণ বেড়েছে। গত বছর জাতীয় সংসদে দেয়া বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের মধ্যে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সবচে বেশী। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে ভারতীয় পক্ষের তেমন কোন আগ্রহ কখনো দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক নিষেধাজ্ঞা অথবা শুল্ক আরোপ করে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশে শিল্পবিনিয়োগেও ভারতের অবদান খুব বেশী নয়।

অথচ লাখ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করে বছরে শত শত কোটি ডলারের রেমিটেন্স দেশে নিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা আঙ্কটাডের এক রিপোর্টে ২০১৪ সালে বাংলাদেশে শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর তালিকায় এক নম্বরে যুক্তরাজ্য (১৮ কোটি ৯ লাখ ডলার), দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরিয়া (১৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলার) এবং তৃতীয় অবস্থানে পাকিস্তানের ( ১৩ কোটি ৭ লাখ ডলার) পরবর্তী দু’টি দেশ সিঙ্গাপুর ও হংকং। অর্থাৎ শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশগুলোর তালিকায় ভারতের নাম নেই। অথচ এ সময়ে ভারতের অন্যতম রেমিটেন্সের উৎস হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ।
অবৈধ ভারতীয় পণ্যে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হয়ে বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থাকে ক্রমশ ভারসাম্যহীন করে তুলছে। ভারতীয় মাদক এবং অবৈধ অস্ত্রে যেমন বাংলাদেশের যুব সমাজ বেপথু-বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, তেমনি ভারত থেকে আসা নিম্নমানের কসমেটিক্স, ওষুধসহ খাদ্যপণ্যে আমাদের জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। গতকাল একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, ভারত থেকে শত শত টন নিম্নমানের ও বিষাক্ত কেমিকেল মেশানো মাছ ও শুঁটকি আসছে কক্সবাজারের মাছ ও শুঁটকির মোকামে। আমাদের সরকার ভারতীয় বাজারে পাটের মত ট্রাডিশনাল পণ্যের বাজার নিশ্চিত রাখতে ব্যর্থ হলেও জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, নিম্নমানের, ভারতীয় পণ্য এবং মাদকের আগ্রাসন বন্ধ করতে পারছে না।

ডব্লিউটিও’র অ্যান্টি ডাম্পিং নীতিমালার অপপ্রয়োগ করে ভারতের উচ্চ শুল্কের কবলে বাংলাদেশের হাজার হাজার রফতানীকারক যখন সর্বস্বান্ত হতে যাচ্ছে, তখনো সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তেমন কোন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। দেশের পাটশিল্প ও রফতানীকারকদের স্বার্থের বিষয় বিবেচনা করে এ বিষয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্টদের দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে বিকল্প বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের পাটশিল্প ও পাটপণ্যের ভারতনির্ভরতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। সারাবিশ্বে পরিবেশগত জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সিনথেটিক পণ্যের বদলে পাটের মত প্রাকৃতিক তন্তুজাত পণ্যের কদর ও চাহিদা বেড়ে চলেছে।

পাটপণ্যের উন্নয়ন, বহুমুখীকরণ এবং নতুন নতুন বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনা এখনো সম্ভব। সেই সাথে পাটপণ্যের আভ্যন্তরীণ বাজারকে আরো বিস্তৃত করার পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক। ভারতের অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে বিশেষ জরুরী ভিত্তিতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসতে হবে। মতৈক্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হলে রফতানীকারকরা যাতে বিকল্প বাজারে পণ্য রফতানীর সুযোগ পান সেদিকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

Facebook Comments