ছাত্রসেনার নেতা এখন ছাত্রলীগ সভাপতি, কমিটির নামে শিবির পুনর্বাসন

126

কেবল সভাপতির বিরুদ্ধেই নয়, ২৭৮ সদস্যের এ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে রয়েছে আরো অভিযোগ। বিশাল এই কমিটিতে শিবিরকর্মী, ইয়াবা ব্যবসায়ী, বিবাহিত, হত্যা মামলার আসামি, গঠনতন্ত্রের বেশি বয়স স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কেউই আগে কখনো ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা।।

ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদই অনুপ্রবেশকারীদের দখলে, এ অভিযোগ নতুন নয়। এবার সদ্যগঠিত চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। কমিটির সভাপতি এস এম বোরহান উদ্দিন আগে ইসলামী ছাত্রসেনার নেতা ছিলেন বলে অভিযোগ জানিয়েছেন কেউ কেউ।

কেবল সভাপতির বিরুদ্ধেই নয়, ২৭৮ সদস্যের এ পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে রয়েছে আরো অভিযোগ। বিশাল এই কমিটিতে শিবিরকর্মী, ইয়াবা ব্যবসায়ী, বিবাহিত, হত্যা মামলার আসামি, গঠনতন্ত্রের বেশি বয়স স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কেউই আগে কখনো ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না বলে জানিয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা।।

বুধবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

অভিযোগে জানা যায়, কমিটির বর্তমান সভাপতি বর্তমান সভাপতি বোরহান উদ্দিন একসময় বোয়ালখালীতে ছাত্রসেনার অর্থ সম্পাদকের ছিলেন।কমিটিতে তালিকায় থাকা বহু সম্পাদকীয় ও শীর্ষ পদধারীরা বেশির ভাগই ইয়াবা ও মাদক কারবারে জড়িত। জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিসহ বিভিন্ন নাশকতা ও হত্যা মামলার আসামি বলেও জানা গেছে।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটির নেতাকর্মীদের বয়স হবে ২৯ বছর। এ ছাড়া যে কোনো জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয় ১০১ সদস্যের। কিন্তু দক্ষিণে জেলা ছাত্রলীগের অনুমোদিত কমিটির সদস্য সংখ্যা ২৭৮ (প্রায়)। সহসভাপতি পদে নয়জন রাখার নিয়ম থাকলেও ঘোষিত কমিটিতে রাখা হয়েছে ৬০ জনেরও বেশি। যুগ্ম সাধারণ পদে পাঁচজন থাকার নিয়ম থাকলেও রাখা হয়েছে ১১ জনকে। সাংগঠনিক সম্পাদকে পাঁচজন রাখার নিয়ম থাকলেও রাখা হয়েছে ১১ জনকে।

ছাত্রলীগের একাধিক সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদ্য অনুমোদিত কমিটিতে পদ পাওয়া সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বর্তমান সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমেদের সরকারি এপিএস। সহসভাপতি সাইদুর রহমান জিহান ত্রিশোর্ধ্ব। তিনি একটি গ্রুপ অব কোম্পানিতে দু’বছর ধরে চাকরি করছেন। সহসভাপতি জয়নুল আবেদিন ফরহাদ ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে কর্মরত। সহসভাপতি মোহাম্মদ মুসার বয়স ৩৫ এবং তার ছাত্রত্ব নেই। সহসভাপতি মামুন বাড়ি চন্দনাইশ নারী নির্যাতন মামলার আসামি। সহসভাপতি মো. খালেদ মাসুদের পুরো পরিবারের জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর রেজা ছাত্রসেনা থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি হয়েছেন।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদরুদ্দোজা জুয়েল জনি হত্যা মামলার আসামিদের সহযোগী এবং অন্য একটি মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক তুহিন বাঁশখালীতে জামায়াত-শিবিরের নাশকতা মামলার আসামির ছেলে এবং এক সময় সক্রিয় শিবিরের রাজনীতি করতেন। যুগ্ম সম্পাদক আরেকুর রহমান তিন মাস আগেও নারী কেলেঙ্কারির জন্য আনোয়ারা কলেজে হেনস্তা হয়েছেন।

পাশাপাশি সাংগঠনিক সম্পাদক কলিমুল্লাহ সাতকানিয়া কেরানিহাটে নাশকতা মামলার আসামি এবং শিবির ক্যাডার ছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদক হামিদ হোসাইন কোতোয়ালি থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ছোট ভাই এবং স্থানীয় এমপি ও প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি করায় দু’বছর আগে বাঁশখালী থানা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদক তসলিম উল্লাহ চৌধুরী শিবিরের সাথি ছিলেন। বাঁশখালী শেখেরখীল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত জামায়াত পরিবারের সন্তান। গ্রন্থনা ও প্রকাশনা উপ-সম্পাদক গাজী আমিনুর রশিদ ৩৮ বছর বয়সী, বিবাহিত এবং একজন অভিযুক্ত চাঁদাবাজ। সাংস্কৃতিক উপ-সম্পাদক মানিক অছাত্র এবং চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত এলাকায়।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, প্রকৃত ছাত্ররা অপ-রাজনীতি আর টাকার নেতৃত্বে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে কমিটিতে অনেকের স্থান হয়নি।

নতুন কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের ১ নম্বর সহসভাপতি মো. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ কমিটিতে এমন অনেক নাম এসেছে যারা এক সময় শিবিরের ক্যাডার ছিল। অনেকে বিবাহিত, চাকরিজীবী অনেকে হত্যা মামলার আসামি। অনেকে আবার এসএসসিও পাশ করেনি। বিশাল অঙ্কের টাকার বাণিজ্যের মাধ্যমে এ ধরনের বিতর্কিতদের কমিটিতে ঠাঁই দিয়ে পুরো কমিটি বিতর্কিত করা হয়েছে।

তিনি বর্তমান সভাপতি এস এম বোরহান উদ্দিন আগে ইসলামী ছাত্রসেনার অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে জানান। বোরহান উদ্দিন কখনো ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না বলেও দাবি তার।

তিনি বলেন, সহ সম্পাদক মোস্তাক আহমদ বিবাহিত, সহসভাপতি সোহরাব হোসেন চৌধুলি শুভ তৌকির হত্যা মামলার আসামি। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন কাফকোতে চাকরি করেন। উপসম্পাদক মোহাম্মদ এনাম বনফুলে চাকরি করেন (পটিয়া)। সহসভাপতি কে এম পারভেজ উদ্দীন এক সময়ের শিবিরের ক্যাডার (জামায়াতের সাবেক এমপি সামশুল ইসলামের খালাত ভাই)। সহসভাপতি মো. মিনহাজুল আবেদীন রেয়াজউদ্দীন বাজার তামাকুমন্ডী লাইনে ডিওর নামক কাপড়ের দোকানদার। উপ-ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক এস এম সাইফুল্লাহ রাহাত ফোর এইচ গ্রুপের হিসাবরক্ষক। সহসম্পাদক মো. রায়হান রেলের খালাসি পদে কর্মরত (পোস্টিং পটিয়া)।

তথ্যমতে, দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন আহ্বায়ক আব্দুল মালেক জনির মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। তখন অনুমোদিত কমিটিতে এস.এম. বোরহান উদ্দিন সভাপতি ও আবু তাহের সাধারণ সম্পাদক নাম ঘোষণা করা হয়। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস.এম.জাকির হোসেন ৫১ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটির অনুমোদন দিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ৬ মাস ধরে আমরা এই কমিটি আটকে রেখেছিলাম। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এই কমিটি দিয়েছি। আমরা বিতর্কিত কাউকে নিয়ে ছাত্রলীগ করতে চাই না। এই কমিটিতে যদি বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারী থাকে, তাহলে আমাদের জানান। তাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।

তবে সভাপতি এস.এম. বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি কখনো ইসলামী ছাত্রসেনার রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম না। আমি আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান। আর কমিটিতে শিবির বা বিতর্কিত কেউ থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে

Loading...