রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে পাকড়াও হওয়া থেকে বাঁচতে বস্তিতে লুকিয়ে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান সারওয়ার্দী

783

লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী ২০ বারের বেশি আত্মগোপনের স্থান পরিবর্তন করেছেন আইনরক্ষা সংস্থার হাতে ধরা পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচতে। এর মাঝে তিনি বস্তিতেও কয়েক রাত কাটিয়েছেন। জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্র নিবাসী সাংবাদিক কনক সরওয়ার এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ও সামরিক মহল এর সমালোচনা করার পর থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সারওয়ার্দী।
বর্তমানে নিজের বাসায় ফিরে আসা সারওয়ার্দী বলেন:

“আমাকে তারা খুঁজছিল যেন আমার পরিচয়টা নিশ্চিত হয়ে আমাকে মেরে ফেলতে পারে তাই। কোনভাবে তারা আমাকে একটা বাসায় ট্রেইস করে ফেলে। আমি সেখান থেকে বের হয়ে যাই। আমি প্রায় ২৩ টি বাসা পরিবর্তন করি ঢাকার বাইরে বিভিন্ন দূরের জায়গায়। খুব খারাপভাবে দিন রাতগুলো কেটেছে … বিভিন্ন জায়গায় থেকেছি, এমনকি, বিশ্বাস করবেন না, বস্তিতেও ছিলাম।”
পালিয়ে থাকার এক পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠিও লেখেন এবং “কেন আমাকে তারা মেরে ফেলবে?” জানতে চান। এর কোন উত্তর অবশ্য তিনি পাননি।

বাসায় ফিরে এলে জীবন হুমকির সম্মুখীন হবেনা এমন ইঙ্গিত সারওয়ার্দী পান একজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে। তারপরই নিজ বাসস্থানে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি।
যদিও সারওয়ার্দী এখন আর পালিয়ে নেই, তিনি বলছেন যে তিনি এখনো ভীত।
“সাংবিধানিক ও নাগরিক সব অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে চলতে পারবো এমন নিরাপদ আমি এখনো বোধ করছি না। আমার চলাফেরার স্বাধীনতা নেই। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও আমাকে চিকিৎসা দিতে ভয় পাচ্ছে। আমার কোন চাকরি পাবার উপায় নেই। আগের চাকরি থেকে জোরপূর্বক আমাকে ছাটাই করা হয়েছে,” অবসরপ্রাপ্ত এই লেফটেন্যান্ট জেনারেল বলেন।

সারওয়ার্দী নেত্র নিউজকে জানান, কনক সরওয়ার এর সাথে তার ফেসবুক সাক্ষাৎকারে যে বিষয়কে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন তা হলো দেশে গণতান্ত্রিক অধিকারের অনুপস্থিতি। এ সাক্ষাৎকারের ফলেই তিনি আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।
“মানুষের কথা বলার অধিকার নেই। দেশে কোনও গণতন্ত্রও নেই, জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করার অধিকারই হারিয়ে ফেলেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে না। যার ফলে সরকারকে পুলিশ, মিলিটারি আর অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জোরে ক্ষমতায় টিকে থাকতে হচ্ছে। আমার সব কথার কেন্দ্রবিন্দুতে এই বিষয়টিই ছিল এবং আমি বলেছি আমি দেশের মানুষের জেগে ওঠার এবং দেশের পক্ষে দাঁড়ানোর ও ত্যাগ স্বীকারের অপেক্ষায় আছি।”

দেশের নাগরিক সমাজ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো সমর্থন না পেয়ে তিনি তীব্রভাবে হতাশ হয়েছেন বলে জানান।
“আমি দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে এ কথাগুলো বলেছি, নিজের স্বার্থে বলিনি। দুর্ভাগ্য এই যে দেশের একটি সংবাদমাধ্যমও, বিশেষত সাংবাদিকরা, বাংলাদেশের কোনো রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের কোনো বুদ্ধিজীবী আমার পক্ষে কথা বলেনি, আমার সমর্থনে আমার পাশে দাঁড়াননি। আমি এতে হতবাক হয়েছি,” সারওয়ার্দী বলেন। “অন্তত একটি সংগঠন হলেও বলা উচিত ছিল “আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি আসুন,” কিন্তু কেউ বলেনি।”

চীনের সাথে কোন সম্পর্ক থাকবার কথা তিনি অস্বীকার করেছেন, বলেছেন চীন এর সাথে তার সম্পর্কের কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়েছেন, কিন্তু সাথে যোগ করেছেন যে বাংলাদেশে চীন আরো বেশি ভূমিকা রাখুক তা তিনি সমর্থন করেন। “বাংলাদেশের জনগণ ভারত ও চীনের আরো সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূমিকা দেখতে চায় বাংলাদেশে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, বাণিজ্য, সামরিক বাহিনী, প্রশাসন, সর্বত্র ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য; কেন তবে চীন বাণিজ্যক্ষেত্র বাদে অন্যান্য কোন ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হচ্ছেনা এবং বাংলাদেশের জনগণের সাথে সম্পর্ক জোরালো করার চেষ্টা করছেনা?”

সারওয়ার্দী তার কথার শেষে বলেন, “আমি লড়তে চাই, আমি চাই জনতা জেগে উঠুক। আমি চাই জনগণ এবার সত্যিকারের পরিবর্তন নিয়ে আসুক। এবং এটা সম্ভব। [উপযুক্ত] একজন নেতা হলেও [তা সম্ভব]। একজন মানুষই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।”