তোফায়েল বঙ্গবন্ধুর ভয়ানক বিপদেও তার ডাকে সাড়া দেননি, দলের উচ্চ পদে তাকে রাখেন কী করে?

627

দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়ে কলাম লিখেছি। বঙ্গবন্ধুর সমর্থনে কলাম যতটা লিখেছি, তার কন্যা শেখ হাসিনার সমর্থনে লিখেছি তার অনেক বেশি। শেখ হাসিনার অর্জন অনেক। তিনি দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করেছেন। দেশদ্রোহী ’৭১-এর ঘাতক এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তি দিয়েছেন। মঙ্গার দেশকে ক্ষুধামুক্ত করেছেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্ময় সৃষ্টি করেছেন। এককথায় বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি নিজের জন্য একটি চিরস্থায়ী আসন তৈরি করেছেন। তার শত্রুরাও এখন বলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।

বাংলায় একটি কথা আছে-‘দশচক্রে ভগবান ভূত’। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, শেখ হাসিনার অভাবনীয় অর্জনগুলো বিনষ্ট করার একটা চক্রান্ত চলছে। শেখ হাসিনা নিজেও কি আবার সেই চক্রান্তের ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছেন? তাকে সুপরামর্শ দেওয়ার জন্য কোনো বর্ষীয়ান ব্যক্তি কি তার চারপাশে নেই? মনে হচ্ছে নেই। তাই সুদূর লন্ডনে বসেও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তার জ্ঞাতার্থে কিছু কথা লিখতে চাই। বঙ্গবন্ধুর জীবনকালেও সাহস করে কিছু সত্য কথা লিখতে চেয়েছিলাম। তিনি ভুল বুঝতে পারেন বলে লিখিনি। তার পরিণাম বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি।

এখন জীবনের অন্তিম সময়ে পৌঁছে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হারাতে চাই না বলেই আমার আজকের এ কলাম লেখা। শেখ হাসিনা আমার ওপর রাগ করতে পারেন, তাকে আমার সম্পর্কে ভুল বোঝানোও হতে পারে। সব ঝুঁকি নিয়ে লিখছি, শেখ হাসিনা, সাবধান, দেশে ’৭৫ সালের সব আলামত বিদ্যমান। কেবল কেউ চোখে দেখছে না। সবচেয়ে দুঃখের কথা, আওয়ামী প্রতিষ্ঠানটিও একটি অনড় অজগরে পরিণত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে একটি সুরার অংশবিশেষ মনে পড়ছে। যে সুরার অর্থ-আল্লাহ বলছেন, ‘আমি যাকে ধ্বংস করতে চাই, সে চোখ থাকতে দেখে না। কান থাকতে শোনে না। আমি তার হৃদয়ে মোহর মেরে দিই।’

বর্তমানের আওয়ামী লীগকেও দেখলে মনে হয়, প্রায় ১০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যের অধিকারী সংগঠনটি এখন ওই অনড় অজগরের মতো। তার মধ্যে এতকালের জাগ্রত চেতনা অনুপস্থিত। দেশে এখন চলছে কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ হামলা, সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মরণব্যাধি ডেঙ্গিজ্বর। টেলিভিশন খুললেই জীবিত রোগী ও মৃতের ছবি। মৃতের জন্য আত্মীয়স্বজনের আর্তনাদ। প্রত্যেক প্রবাসী বাঙালি নিজের জন্য যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনই উদ্বিগ্ন দেশের আত্মীয়স্বজনের জন্য। এ সময় বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগে কাদের টেলিফোন করেছিলেন বা জিয়ার কবরে কার লাশ তা নিয়ে কি বিতর্ক সৃষ্টি করা চলে? প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিতর্কে যোগ দিয়েছেন। এ সময় এসব বিতর্কে জড়িত হওয়া কি কারও সাজে? বিশেষ করে তিনি যদি ক্ষমতাসীন দলের কেউ হন।

জিয়ার কবরে কার লাশ তা নিয়ে এতদিন পর বিতর্ক সৃষ্টি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনায় মেধাশূন্যতার পরিচয় দেয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, ‘চন্দ্রিমায় জিয়ার লাশ নেই, এ কথা জেনেও বিএনপি কেন নাটক করছে?’ প্রধানমন্ত্রী কি নিজেও নিশ্চিত, কবরের লাশটি জিয়ার নয়? চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়াকে হত্যার পর তার লাশ প্রথমে একটি জঙ্গলে পুঁতে ফেলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেই লাশ উদ্ধার করে জাতীয় সংসদের এলাকা চন্দ্রিমায় কবর দেওয়া হয়েছিল। তখনো গুজব রটেছিল, এটা জিয়ার লাশ নয়। অন্য কারও বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি হয়ে থাকে অন্যের কিছু বলার নেই। কারণ, জিয়ার লাশ বাক্স থেকে তুলে পরীক্ষা না করা সত্ত্বেও তার পরিবার এবং রাজনৈতিক দলটি চট্টগ্রাম থেকে আনা লাশটিকে জিয়ার বলে মেনে নিয়েছে এবং বছর বছর এ চন্দ্রিমায় এসে জিয়ার জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করছে। আওয়ামী লীগ তাতে আপত্তি করেনি।

তাহলে এ ইস্যুটি নিয়ে এখন এতো হইচই কেন? আর এ হইচইয়ের মাঝে আসল ইস্যুটি হারিয়ে যেতে বসেছে। আসল ইস্যুটি হচ্ছে লু কান সাহেবের প্লান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ ভবনকে এবং তার সংলগ্ন এলাকাকে তৈরির কাজটি শেষ করা। লু কান সাহেবের প্লানটির তোয়াক্কা না করে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিয়ে জিয়াউর রহমান, সবুর খান, শাহ আজিজের মতো ব্যক্তিদের কবর এখানে যারা দিয়েছেন, তাদের দূরদৃষ্টির প্রশংসা করা চলে না। এ মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে জিয়ার কবর এখান থেকে সরানো উচিত কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। সেই বিতর্কে না গিয়ে কবরস্থ লাশটি কার এতদিন পর তা নিয়ে প্রশ্ন করার অবকাশ কোথায়? অথচ সরকারি দল ও বিরোধী দল হাস্যকরভাবে কবরের লাশটি কার এ বিতর্কে মেতেছেন। তাদের মধ্যে বিতর্ক চলতে পারে জিয়ার কবর বলে চিহ্নিত কবরটি স্থানান্তর করা সংগত কি না তা নিয়ে? যদি কোনো মহলের জানতে ইচ্ছা করে জিয়ার কবরের লাশটি কার, তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট সবার অনুমতি নিয়ে কবর থেকে লাশ তুলে তার ডিএনএ টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করতে পারেন।

আসল বিতর্কে আসি। জিয়া এবং অন্যদের কবর এখান থেকে সরানো উচিত কি না। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির ধারণা অবশ্যই সরানো উচিত। তাতে জাতীয় সংসদের জমি উদ্ধার করা হবে। লু কান সাহেবের প্ল্যান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের যে কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে, তা সমাপ্ত হবে। দ্বিতীয়ত, তাতে মৃত ব্যক্তিদের সম্মানহানি হবে না। স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কোর মরদেহ যেখানে কবর দেওয়া হয়েছিল, মাদ্রিদের সেই সিটি সেন্টার থেকে তার কবর অন্যত্র সরানো হয়েছে। ঘানার এনক্রুমা মারা গিয়েছিলেন প্রতিবেশী আরেক দেশে। সেখানেই তাকে সমাধি দেওয়া হয়, ঘানায় সামরিক শাসন শেষ হলে জনগণ সেই মরদেহ কবর থেকে তুলে এনে ঘানায় সমাধিস্থ করে। ভারতের খেলাফত আন্দোলনের নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী লন্ডনে মারা যান। তাকে প্রথম সমাধি দেওয়া হয় লন্ডনে। তারপর তার মৃতদেহ কবর থেকে তুলে জেরুজালেমে হজরত ওমরের মসজিদে সমাহিত করা হয়। এরকম উদাহরণ বহু। কবর পরিবর্তনে এদের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের মর্যাদাহানি না হলে বাংলাদেশে জেনারেল জিয়ার কবর স্থানান্তরে তার মর্যাদাহানি হবে কেন? বিএনপির উচিত হবে না এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু করা। অন্যদিকে এটা নিয়ে এতদিন পর আওয়ামী লীগ নেতাদের বিতর্কে নামা দলের ভেতর হীনম্মন্যতাবোধের জন্ম হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এটা আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের জন্যও মর্যাদাহানিকর।

জাতির পিতাকে তার পরিবারের বহু সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘাতকদের জন্য জাতির মনে চিরকাল তীব্র ঘৃণা বিরাজ করবে। আওয়ামী লীগ সরকার জাতির পিতার ঘাতকদের কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। আরও কিছু পলাতক রয়েছে এবং এ ষড়যন্ত্রের নেপথ্যের নায়কদের অনেকেই ভোল পালটে এ সমাজেই বিচরণ করছেন। তাদের কেউ কেউ হয়তো বঙ্গবন্ধুপ্রেমী সেজে এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে অথবা প্রধানমন্ত্রীর আশপাশেই অবস্থান করছেন। এদের চিহ্নিত করার জন্য বহু আগে সরকারের কাছে একটি নিরপেক্ষ কমিশন অথবা দক্ষিণ আফ্রিকার কায়দায় ট্রুথ কমিশন গঠনের দাবি তোলা হয়েছিল। সরকার কমিশন গঠনের কথা কানে তোলেনি। আওয়ামী লীগের কোনো এমপি বা মন্ত্রী হঠাৎ সংসদে বা সংসদের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজ দলের কারও কারও প্রতি সন্দেহের তির নিক্ষেপ করেছেন। মানুষ তা ভালোভাবে নেয়নি। এবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর দুই বিশ্বস্ত সহচরের দিকে সন্দেহের তির নিক্ষেপ করেছেন। তোফায়েল আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ঘাতকদের দ্বারা বেষ্টিত হলে তোফায়েল আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাককে টেলিফোন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ কথা দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর অন্তিম সময়ের আহ্বানে তার দুই শিষ্য সাড়া দেননি। কেন দেননি? তারা কি ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন, না ভয়ে বের হয়ে আসেননি?

একটি অর্ধসমাপ্ত কথার অভিযোগ ভয়ানক। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য আবদুর রাজ্জাককে পাওয়া যাবে না। তিনি মৃত। বেঁচে আছেন একমাত্র তোফায়েল আহমেদ। তোফায়েলকে বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত স্নেহ করতেন। আবার বঙ্গবন্ধু খেতাবটিও তোফায়েল আহমেদের দেওয়া। তোফায়েল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব এবং হাসিনা মন্ত্রিসভায় দুই দফায় মন্ত্রী। তার একটি মাত্র অপরাধের কথা আমরা জানি, তিনি এক/এগারোর সময় মাইনাস টু ফর্মুলায় সমর্থন দিয়েছিলেন। তার শাস্তিও তিনি পেয়েছেন মন্ত্রিসভায় একদফায় অন্তর্ভুক্ত না হয়ে।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা-তিনি যদি জানতেনই তোফায়েল বঙ্গবন্ধুর ভয়ানক বিপদের সময়েও তার ডাকে সাড়া দেননি, তাহলে দলের উচ্চ পদে তাকে রাখেন কী করে? আর যদি তথ্যটা সদ্য জেনে থাকেন, তাহলে প্রমাণসহ তা উপস্থিত করে তাকে দল থেকে সরাচ্ছেন না কেন? প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে অপ্রমাণিত লঘু কথা বলা হলে জনসাধারণের কাছে প্রধানন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। সময়টা ভালো নয়। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করা উচিত মনে করছি।

তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার কোনো জবাব তিনি দেবেন কি না তিনিই জানেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার সবিনয় নিবেদন, কোভিড ও ডেঙ্গির কারণে দেশের অবস্থা ভালো নয়। এ সময় দেশের মানুষ বিপদতাড়িনী হিসাবে তাকে পাশে দেখতে চায়। এ সময় কোনো অনাবশ্যক বিতর্কে জড়িত হওয়া, দায়িত্ব না নিয়ে কথা বলা ক্ষমতাসীন দলের কারোরই উচিত নয়।