আমাকে তো ভুলায়ে-ভালায়ে নিয়ে গেছে সেদিন: একান্ত আলাপে পরীমণি

148

সবাইকে বিস্মিত করে মাদক মামলায় দফায় দফায় রিমান্ড আর টানা ২৭ দিনের জেল খেটে অবশেষে জামিন মিললো পরীমণির। ১ সেপ্টেম্বর তিনি কাশিমপুর কারাগার থেকে বেরিয়েই বুঝি মুক্ত বাতাসে ডানা মেলে দেন। নামের সার্থকতা মেলে সেখানেই। অথচ অনেকেই ভেবেছেন, গ্রেফতারের আগমুহূর্তে পর্দার জন্য প্রস্তুত হওয়া বিপ্লবী ‘প্রীতিলতা’র বুঝি এখানেই ইতি। জেল ফেরত এক নতজানু পরী অথবা প্রীতিলতার দেখা মিলবে। সব ধারণা ভুল প্রমাণ করলেন ঢাকাই সিনেমার এই বিপ্লবী। শুধু হুডখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে হাত নাড়ানোই নয়, ঘরে ফিরেও পরীকে পাওয়া গেলো ভয়-ডরহীন।

সিরিয়ার সেই তিন বছরের ছেলেটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে সবার। বোমায় ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে মরে যাওয়ার আগে যে বলেছিল, ‘আমি আল্লাহকে সব বলে দেবো’! বুধবার (১ সেপ্টেম্বর) রাতে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে পরীমণির একান্ত আলাপেও খুঁজে পাওয়া গেলো সেই কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। তিনি বললেন, ‘আমার অনেক কিছু বলার আছে, সব বলে দেবো। বলার জন্য অস্থির হয়ে আছি।’

পরীর প্রতি প্রথম প্রশ্ন ছিল এমন, জেল থেকে এভাবে এই গেটআপে এতটা হাস্যোজ্জ্বল হয়ে ফেরার পরিকল্পনা কী ভেবে? কারণ, আটকের শুরু থেকে আদালতের এজলাস পর্যন্ত- আপনাকে দেখা গেছে ভেঙে পড়া কোনও এক…।

জবাবে পরী বলেন, ‘ভেঙে আমি একবারও পড়িনি। যেটা বলছেন সেটা ছিল ক্রোধ আর অসহায়ত্ব। আর জামিনের বিষয়টি আমার কাছে মুক্তির মতোই আনন্দ দিয়েছে। আমি জামিন পেয়ে হাতে মেহেদি লাগিয়েছি। গেট থেকে বেরিয়ে মুখ লুকাইনি। আমার আনন্দ বা বিজয়টাকে সবার সঙ্গে শেয়ার করে নিয়েছি। আমি হি হি করতে করতে, দাঁত কেলাতে কেলাতে জেল থেকে বের হয়েছি। তো আমি দাঁত কেলাবো না তো কে কেলাবে? আমি চুরি-ডাকাতি বা মার্ডার করিনি। এখানে কোনও প্ল্যান বা উন্মাদনা ছিল না। আমার ভেতরে মুক্তির যে আনন্দটা কাজ করেছে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। ফলে হুট করে আমাকে কোনও কিছু চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমি পর্দায় অভিনয় করি, জীবনের সঙ্গে নয়।’

জেল থেকে ফিরে হুডখোলা গাড়িতে পরীমণি
পরী আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন আমি কেমন মুক্ত মানুষ। আমি নিজেকে পাখির মতো মুক্ত ভেবেছি আজীবন। একমাত্র নানুভাই ছাড়া আমার আর কোনও পিছুটান নেই। তাই জামিন পাওয়ার পর আমি ২৭ দিনের দুঃখ, অপমান ক্ষণিকের জন্য ভুলে যাই। আকাশে উড়তে থাকলাম কাশিমপুর থেকে বনানী পর্যন্ত।’

পরী জানান, ২৭ দিনের জেল জীবনে তিনি এক ঘণ্টাও ঠিকমতো ঘুমাননি। বলেন, ‘আমি গত ২৭ দিন ঘুমাইনি। জাস্ট কাশিমপুর থেকে বেরিয়ে এক দেড়ঘণ্টা ঘুমিয়েছি গাড়িতে। মাথাও ঠিকমতো কাজ করছিল না। বাট জেল থেকে বেরিয়ে এই মুক্ত জীবন আর মানুষের উন্মাদনায় আমি সব ক্লান্তি ভুলে যাই। সত্যিই আমি আমার পাখির জীবনটা ফিরে পেয়েছি কাশিমপুর টু বনানীর পথে।’

তবে কি নিজ বাসায় ফিরেও জেলখানা বোধ করছেন! ‘একদমই না। আবার অনেকটা তাই! আমি না, এই বাড়ির সবাই জেলজীবন ভোগ করছে শুধু আমার কারণে। আমার বাড়িওয়ালা আন্টি থেকে শুরু করে এই বাড়ির প্রতিটি মানুষ আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে, অনেক সহ্য করেছে। এখন আমার নিজেরই অসহ্য হয়ে গেছে আমাকে। কারণ, আমার জন্য গত দুইটা মাস এই বাড়িটা চিড়িয়াখানায় পরিণত হয়েছে। মধ্যরাতে জানালা দিয়ে উঁকি দিলেও দেখা যায় অসংখ্য মানুষ ক্যামেরা বা মোবাইল তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। সবকিছুর তো একটা সহ্য ক্ষমতা আছে’—বললেন পরী।

এসব কারণেই বাড়ি ছাড়ার নোটিশ পেলেন বা পরিকল্পনা করছেন সম্ভবত! পরী বলেন, ‘অনেকটা তাই। আমি বাড়ির মালিক হলে তো বলতাম, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাড়ি ছাড়ো পরী’। এনারা তো সেভাবে বলছেন না। আমার বাড়িওয়ালা এটুকুই বলছেন, বাড়ির সামনে যে গণ্ডগোল সেটা সবার ক্ষতি করছে। এটুকু সমাধানের কথা বলছেন। দেখি, আমিও আসলে একটু নিজের মতো থাকতে চাই। কারণ, পুলিশ, সাংবাদিক, ভক্ত, ইউটিউবার থেকে শুরু করে এই বাসার ঠিকানা সমগ্র বাংলাদেশ জানে। ফলে এখানে আমার আর থাকার সুযোগ নেই। সেটার জন্যেও দুই-তিন মাস সময় তো লাগবে। দেখা যাক।’

পরী বলেন, ‘আমার আর অজানা কিছু তো নেই। কোথায় মদের বার, কোথায় চুলা- সবই তো বের করে ফেলেছেন সবাই। তবু কেন এমন হয়রানি চলবে? আমার কাছে জানার তো আর কিছু নেই।’

পরীর হাঁড়ির খবর হয়তো আর কিছু অজানা নেই। তবে জেল জীবনের ২৭ দিনের কথা মানুষ জানতে চায়। পরীও সেসব বলতে চান। যদিও অনেকে ধরে নিয়েছেন, মুখ বন্ধ রাখার শর্ত মেনেই জামিন পেয়েছেন পরীমণি। কিন্তু তার ভাষ্যে তেমনটা মনে হয়নি একবারও।

পরীমণির বাসার সামনের দৃশ্য
পরী বলেন, ‘আমি তো আসলে গত ২৭ দিন মৃতই ছিলাম। জীবন্মৃত আরকি। আসলে এসব নিয়ে আমার অনেক কিছু বলার আছে আপনাদের। অনেক কিছু আছে। আমি তো কিছুই বলতে পারিনি এখনও।’

তো বলেন, আপনার জেল জীবনের কথাগুলো। বলতে গিয়েও বললেন না পরীমণি। ক্লান্তিতে তার কণ্ঠ টলটলে। তবু বললেন, ‘আমাকে তো ভুলায়ে ভালায়ে নিয়ে গেছে সেদিন (আটকের দিন)। আমাকে যে সেদিন অ্যারেস্ট করেছে তারা (র‌্যাব), সেটাই জানতাম না। এসব ডিটেল বলতে হবে আপনাদের। আমার অনেক কিছু বলার আছে। আমি কখন বলবো, সেই অস্থিরতায় দম ফেটে যাচ্ছে। ২৭টা দিন আমি ঘুমাইনি। একটু ঘুমোতে চাই। জেলে যাওয়ার আগেই আমার মাথার অসুখটা বেড়েছিল। অসুখটার নাম ভার্টিগো। কখনও মাথা ঘোরে। কখনও মনে হয় চারপাশটা ঘোরে। এ এক অসহ্য অসুখ। একটু স্থির হই, সুস্থ হই। আমি সব বলবো। কারণ, আমার জীবনে লুকানোর কিছু নেই। আমি একটা খোলা বই।’

এদিকে গতকাল (১ সেপ্টেম্বর) থেকে ভাইরাল হলো পরীর হাতে লেখা ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’ সংলাপটি। এটি লেখার কারণ প্রসঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন, “এটা লিখেছি আমার চারপাশের দু’মুখো সাপগুলোর জন্য। যারা ভালোবাসা মুখে দেখায়, কিন্তু হৃদয়ে বিষ ধারণ করে। আমার বিশ্বাস, যাদের জন্য বলেছি, তারা ঠিকই টের পেয়েছেন।’

ফের শুটিংয়ে ফেরা প্রসঙ্গে পরীর অভিমত, মাত্র ফিরেছেন। এখনও নির্মাতাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়নি। আটকে থাকা কাজগুলো তিনি দ্রুত করতে চান। কাজের বিষয়ে আইনি কোনও বাধাও নেই। তবে অপেক্ষা, শারীরিক ও মানসিক স্থিরতার।

উল্লেখ্য, ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ২১ মিনিটে আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভীর কাছে পরীকে হস্তান্তর করে কাশিমপুর কারা কর্তৃপক্ষ। মাদক মামলায় ২৭ দিন পর জামিন পেলেন এই শীর্ষ নায়িকা।

এর আগে মঙ্গলবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে পরীমণির জামিনের আদেশ দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ। নারী, অভিনেত্রী ও অসুস্থতা বিবেচনায় ৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় তিনি পরীমণির জামিন মঞ্জুর করেন।

গত ৪ আগস্ট রাতে রাজধানীর বনানীর বাসায় প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে পরীমণি ও তার সহযোগীকে আটক করে র‍্যাব। তার বাসা থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয় বলে জানানো হয়। আটকের পর তাদের নেওয়া হয় র‍্যাব সদর দফতরে। পরে র‍্যাব-১ বাদী হয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে পরীমণির বিরুদ্ধে মামলা করে।