ভিক্ষার ঝুলি হাতে ঘুরছেন আ.লীগ নেতা!

62

সাতক্ষীরার সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলসের এক সময়ের শ্রমিক বর্তমানে আওয়ামী লীগের একটি ওয়ার্ড কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। দিনের রোজগারের টাকায় হোটেল থেকে খাবার কিনে খেয়ে কোনোমতে দিন গুজরান করছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামের এই নেতা বজলুর রহমান (৭২)।

নিজ বাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি ছোট ছেলের নামে লিখে দেওয়ার পর থেকে বজলুর রহমান মাগুরা দোতলা মসজিদের পাশে আব্দুর রউফের একটি পুরনো বাড়িতে ভাড়া থাকেন।
প্রতিদিন সকালে বজলুর রহমানকে দেখা যায় মাথায় টুপি, কাঁধে গামছা আর বগলে ছাতা নিয়ে নিকটস্থ কদমতলা বাজার, সাতক্ষীরা সিটি কলেজ এলাকা, শহরের বাস টার্মিনাল এলাকা, মাধবকাটি এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানে দোকানে দোকানে গিয়ে হাত পাততে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বজলুর রহমান এভাবেই কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।

তার বড়ছেলে আবুল কালাম সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। ছোটছেলে আব্দুস সালাম আদিল বাবু পোলট্রি ব্যবসায়ী। একমাত্র মেয়ে নিলুফার ইয়াসমিন সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আতাউল গনি ওসমানির স্ত্রী। বজলুর রহমানের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন বড় ছেলের বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয় পেলেও বজলুর রহমান ঘুরছেন পথে পথে।
আক্ষেপ করে বজলুর রহমান বলেন, আমার বড়ছেলে চাকরিজীবী এবং ছোট মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে- এমন যুক্তি দেখিয়ে ছোটছেলে আব্দুস সালাম আদিল বাবু আমার জমি ও বাড়ি লিখে দেওয়ার জোর চাপ দিয়ে আসছিল। একপর্যায়ে সে জানিয়েছিল আমার ও আমার স্ত্রীর আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব তার ওপর। এই সরল বিশ্বাসে পাঁচ বছর আগে মাগুরায় ৬ শতক জমির ওপর তৈরি একতলা বাড়িটি তার নামে লিখে দেই।

তিনি বলেন, এরপর থেকে সালাম আদিল বাবু আমার ও আমার স্ত্রীর ওপর নানাভাবে অত্যাচার নির্যাতন করতে থাকে। না খেয়ে কোনোমতে কাটিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মাসতিনেক আগে ছোটছেলে আমার স্ত্রী সুফিয়া খাতুনকে মারধর করে তার মোবাইল ভেঙে দেয় এবং আমাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে বাড়ি থেকে জোর করে নামিয়ে দেয়। নিরুপায় হয়ে বড় ছেলের বাসায় গিয়ে আশ্রয় পাই। কিন্তু সেখানে থাকার জন্য গৃহ সমস্যা থাকায় আমি নিজে অন্যের বাসায় থাকি।
বজলুর রহমান জানান, আমি লাবসা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৮নং ওয়ার্ডের সভাপতি শেখ তৌহিদুজ্জামান তোতার মৃত্যুর পর থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে রয়েছি।

এখন কপর্দকহীনভাবে অন্যের কাছে হাত পেতে দিন চালাচ্ছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি বয়স্ক ভাতা পাই; তবে চাকরি জীবনের পেনশনের সব টাকা ওই বাড়ির পেছনেই চলে গেছে।
আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটাবেন তা উল্লেখ করে বলেন, শুক্রবার মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ২০০ টাকার মতো পেয়েছিলাম। আজ শনিবার পেয়েছি ১০০ টাকা। এ টাকায় হোটেলের ভাত-রুটি কিনে আমি বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।
তার বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রানা জানান, বজলুর রহমান চাচার কষ্টের সীমা নেই। তিনি ছোট ছেলের দ্বারা বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। আমরা তাকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
বড়ছেলে আবুল কালাম জানান, আম্মাকে আমার কাছে রেখেছি। আব্বাকেও রাখতে চাই। কিন্তু আব্বা আমার বাড়ির গৃহসংকট দেখে থাকতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক শেখ হারুনার রশিদ যুগান্তরকে বলেন, বজলুর রহমান একজন শ্রমিক নেতা ছিলেন। আজীবন আওয়ামী লীগ করেছেন। এখন তিনি ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে ৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।
তার প্রতি তার ছেলে অমানবিক আচরণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।

স্থানীয়রা জানান, বজলুর রহমানের আদি বাড়ি ছিল যশোরের সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নে। ১৯৮০ সালের পর সাতক্ষীরার সুন্দরবন টেক্সটাইল মিলস শ্রমিক হিসেবে চাকরি করেছেন দীর্ঘদিন। মিলটি বন্ধ হওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চাকরিতে ছিলেন। তার ছেলে আব্দুস সালাম আদিল বাবু একজন মাদকাসক্ত যুবক এবং তিনি একটি মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করে থাকেন বলে মাগুরা মিলবাজার এলাকার অধিবাসীদের অভিযোগ।
এসব বিষয়ে জানতে আব্দুস সালাম আদিল বাবুর মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে।