‘কৌশলগত কারনে’ চীনের পর বাংলাদেশকে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

122

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তির ঘাটতিটা পুরো বিশ্বের সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়েছিলো যখন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা জোয়ারের মতো বাংলাদেশে ঢুকলেও কোন পরাশক্তি সাহায্য করার জন্য মাথা ঘামায়নি। এমনকি বাংলাদেশের সাথে যে ‘স্থায়ী বন্ধুত্বের’ দাবি করে, সেই ভারতও ইয়াঙ্গুনের কাছ থেকে কূটনীতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার আশায় মিয়ানমারের পক্ষ নেয়। মিয়ানমার যখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল, এই ব্লকের বড় ভাই চীনও তখন মিয়ানমারের হাত ধরে ছিল।

তবে, তিন বছর বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক দীর্ঘ সময়, এবং বাংলাদেশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু ইতিবাচক মনোযোগ পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত-চীন সঙ্ঘাতের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে। কৌতুহলের ব্যাপার হলো, ‘দুর্বলতা’ মনে হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটা কৌশলগত পণ্য হয়ে গেছে এবং বাংলাদেশ তার নিরপেক্ষ অবস্থানটাকে নিজের সুবিধায় কাজে লাগাচ্ছে।

ভ্যাকসিন কূটনীতি

চীন বাংলাদেশের তিস্তা নদীর পানি প্রকল্পে অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে যেখানে ভারতের জন্য মারাত্মক নেতিবাচক দিক রয়েছে, এবং এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনাও হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা যেভাবে ঢাকা আসেন, তাতে জরুরি পরিস্থিতিটি বোঝা গেছে, কিন্তু বাংলাদেশ তার জন্য ঠিক সেভাবে গালিচা বিছিয়ে দেয়নি। ঢাকা বরং এ রকম বার্তা দিয়েছে যে, শুধু ভারত নয়, বরং বাংলাদেশের এখন চীনের মতো অন্যান্য বড় বন্ধু রয়েছে। তবে বৈঠকের সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে কেউই বাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নিয়ে কথা বলেনি। তারা বলেছে, বৈঠক হয়েছে ভ্যাকসিন নিয়ে। ঢাকার কিছু নৈরাশ্যবাদী বলয়ে এটা নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে। তবে, বাংলাদেশকে কে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে, এটা নিয়ে মূলত যুদ্ধটা চলছে চীন আর ভারতের মধ্যে।

ইতোমধ্যে, করোনা সঙ্কট নিয়ে জনগণের উদাসীনতা বাড়ছে। জীবিকার উপর বড় একটা আঘাত এসেছে, এবং সেটা উদ্ধার করতেই বহু মানুষ এখন বেশি আগ্রহী। স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে জনগণের আত্মবিশ্বাস বাড়েনি। তবে, মৃত্যুর হার কম হওয়ার কারণে, অর্থনৈতিক বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ

এদিকে, মিডিয়া প্রতিষ্ঠান নিক্কি এশিয়ান রিভিউ জানিয়েছে যে, মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মার্ক এসপার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আধুনিকায়ন করার প্রস্তাব দিয়েছেন। বোঝাই যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় মিত্র হিসেবে দেখছে। লরা স্টোনের একটি ইমেইলের উদ্ধৃতি দিয়েছে নিক্কি এশিয়ান রিভিউ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া অ্যাফেয়ার্স ডেস্কে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান ও মালদ্বীপের বিষয়টা দেখাশোনা করেন লরা স্টোন। তিনি বলেছেন: “বাংলাদেশের সাথে নিরাপত্তা সহযোগিতা গভীর করার চেষ্টা করছি আমরা, যেখানে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি আমরা সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা বজায় রাখছি। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি বিক্রির ব্যাপারে বাংলাদেশকে আমরা পছন্দের দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছি এবং এ জন্য আমরা প্রস্তুত আছি”।

এটা ভালো যে, বাংলাদেশের কথা খেয়াল করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু চীনের তুলনায় তাদের সামরিক সরঞ্জাম খুবই ক্ষুদ্র। তাছাড়া, চীন বাংলাদেশের সাথে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছে। তিস্তা নদীর তহবিল নিশ্চিত করতে পারলে, বাংলাদেশ হয়তো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে অত বেশি মাথা ঘামাবে না, এদের অনেককেই হয়তো শিগগিরই বন্যা-প্রবণ দ্বীপে স্থানান্তরিত করা হবে।

কে চায় মার্কিন অস্ত্র?

বাংলাদেশের মূলত দুটো প্রতিবেশী দেশ রয়েছে – প্রধানত ভারত, এবং সামান্য কিছুটা মিয়ানমার। নিরাপত্তার বিবেচনায় বাংলাদেশ ভারতের সাথে লড়তে পারবে না, এবং অন্য দেশ মিয়ানমারের সাথেও তারা লড়বে না। সে কারণে বহির্শত্রুর মোকাবেলার বাইরেও সামরিক অস্ত্রের একটা ব্যবহারোপযোগী ক্ষেত্র থাকতে হবে। যদিও এর একটা প্রেস্টিজের দিকও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাংলাদেশকে তাদের সার্বিক প্রশান্ত নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখে, কিন্তু বাংলাদেশ সম্ভবত সেটা দেখে না। বাংলাদেশ মূলত অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকে দেখে, নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। তারা এটাও জানে যে, কেউই আসলে বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধ করতে চায় না।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া অস্ত্র হয়তো ভালো হবে, কিন্তু সিনো-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে অর্থনৈতিক ব্যাপ্তি, সেটা আরও আকর্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অস্ত্র দেবে, কিন্তু তিস্তা প্রকল্পের জন্য সম্ভবত তারা কোন অর্থ দেবে না। বাংলাদেশ চাহিদা থাক বা না থাক কিছু অস্ত্র হয়তো আসতে পারে। তাতে সেনাবাহিনী খুশি হবে। কিন্তু সেটার তাৎপর্য কৌশলগত ক্ষেত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

কিছু স্কলার বলেছেন যে, সন্ত্রাসবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলা সহযোগিতা একটি উদীয়মান ক্ষেত্র, কিন্তু (২০১৬ সালের) হোলি আর্টিজান হামলার পর সব জিহাদিদের মূলত মুছে ফেলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, তবে বর্তমান সরকারের জন্য সন্ত্রাসবাদ উচ্চ অগ্রাধিকারের কোন ইস্যু নয়। এটা ইস্যু ঠিক আছে, কিন্তু বড় ইস্যু নয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্র বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে না পারার কারণেই বাংলাদেশকে তারা উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে মনে করছে, কিন্তু বিগত কয়েক বছরে তার কিছুই প্রমাণিত হয়নি। সে কারণে, বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র হওয়ার সম্ভাবনা মনে হচ্ছে খুবই সামান্য।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় এনজিওগুলোর জন্য কাজ তৈরি হয়েছে। মাদক পাচারও সহজ হয়ে গেছে এখানে। অনেক শক্তিধর ব্যক্তি এখান থেকে রোজগার করছে।

বাংলাদেশ সেই সব দেশ হিসেবে ভালো একটা উদাহরণ যারা চুপচাপ থাকে, এবং যাদের কৌশলগত দুর্বলতাটাই তাদের জন্য কৌশলগত শক্তি হয়ে গেছে। বড় শক্তিগুলো থেকে যত বেশি দূরে থাকার যে নীতি বাংলাদেশ অনুসরণ করে, সেটা ভালো ফল দিয়েছে।