ভ্যানে সবজি বিক্রি করে অসহায় নারীর জীবনযুদ্ধ

6

দিনাজপুর: হাড় কাঁপানো শীতের ভোরে কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। সামান্য দূরের কিছুরও দেখা মেলে না। এর মধ্যেই বিছানা ছেড়ে ঘরের বাইরে ছুটতে হয় রুটি-রুজির তাগিদে। ঠিকমতো ঘুমও ভাঙে না, ঘুমভরা চোখেই আসেন পাইকারি বাজারে। কিনে নেন লাউ, পালং শাক, মিষ্টি কুমড়ো, ডাটা শাক, বেগুনসহ নানা শাক-সবজি। এরপর ভ্যানে সাজিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন সেসব পণ্য। সারা দিনের আয়ে চালিয়ে নেন নিজের একলা-নিঃসঙ্গ জীবন।

এটাই হচ্ছে দিনাজপুর শহরের ভ্রাম্যমাণ শাক-সবজি বিক্রেতা লাইলি বেগমের (৪৭) বেঁচে থাকার সংগ্রামের একদিন-প্রতিদিনের গল্প। বাহাদুর বাজারের পাইকারি আড়ৎ থেকে সবজি কিনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাড়া-মহল্লায় বিক্রি করে কঠিন-কঠোর এ জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

সততা-নিষ্ঠা, চেষ্টা-পরিশ্রমে শহরের নারীদের কাছে জনপ্রিয় লাইলি বেগম। পাইকারি সবজি বিক্রেতা আড়ৎদাররাও বিশ্বাস করেন তাকে।

শহরের পশ্চিম বালুয়াডাঙ্গা হঠাৎপাড়া এলাকার রেজাউল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন লাইলি। গত চার বছর আগে অন্যত্র বিয়ে করে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন স্বামী। এরপর থেকেই পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে সবজি বিক্রি করে দিনাতিপাত করছেন স্বামী-সন্তানহীন এই নারী।

বাহাদুর বাজারের সবজির আড়ৎদার মো. উজির আলী বাংলানিউজকে বলেন, ‘লাইলি আপা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কাছ থেকে সবজি কিনে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করছেন। কোনোদিন তার কাছে টাকা না থাকলে সকালে বাকিতে নিয়ে সন্ধ্যায় ঠিকমতো পরিশোধ করে দেন। লেন-দেনে লাইলি আপা খুবই পাকা। আমরা বাজারের অধিকাংশ আড়ৎদার তাকে সবজি দিয়ে থাকি। কোনোদিন তার সঙ্গে দুই কথা হয়নি। সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন। আমরা আড়ৎদার-মালিকরাও সব সময় কম দামে বিক্রি করে তাকে সহযোগিতা করি’।

শহরের বালুবাড়ি এলাকার গৃহিণী রিনা আক্তার বলেন, ‘লাইলি বেগমের জন্য আমাদের অনেক সুবিধা হয়। বাজারে না গিয়ে বাড়িতে বসেই স্বল্প মূল্যে তরি-তরকারি মিলছে। যাচাই করেও দেখেছি, লাইলি যে দাম ধরেন, বাজারেও ঠিক সেই দাম। তাই আমরা এলাকার অধিকাংশ নারীই তার কাছ থেকে তরি-তরকারি কিনি। নারী হিসেবে অন্য একজন নারীকে সহযোগিতাও করা হয়’।

রোববার (১০ ডিসেম্বর) সকালে শহরের মিশন রোড এলাকায় সবজি বিক্রির ফাঁকে লাইলি বলেন, ‘গাইবান্ধায় আমার বাবার বাড়ি। ২৫ বছর আগে স্বামী বিয়ে করে সেখান থেকে নিয়ে আসেন। গত ৪ বছর আগে অন্যত্র বিয়ে করে সেখানেই থাকেন তিনি, খাওয়া-খরচা কিছুই দেন না! স্বামী-সন্তান নেই, গ্রামের বাড়িতে বাবা-মাও মারা গেছেন। ভাই-বোনেরাও নিজ নিজ সংসার নিয়েই ব্যস্ত। বাঁচতে হলে তাই কিছু একটা করতে তো হবে’।

তিনি বলেন, ‘ভোরে সবজি কিনে দিনে ২০ টাকা ভাড়ায় ভ্যান নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করি। আমার অধিকাংশ গ্রাহক পাড়া-মহল্লার নারী। আমি বেশি লাভ করি না, অল্প লাভে বিক্রি করি। এজন্য আমার গ্রাহকরা বিশ্বাস করে কেনেন। সারাদিন বিক্রির পর খরচ বাদ দিয়েও ৩৫০-৪০০ টাকা টেকে। খাওয়া-খরচা করে যা থাকে, তা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছি। এখন আমার জীবন ভালোই চলছে’।

বাংলাদেশ সময়: ১২০৫ ঘণ্টা, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭এএসআর