বড় ব্যয়ে অহেতুক প্রকল্প কেন

6

বাংলাদেশের ভৌত অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু অবকাঠামো প্রকল্প বাছাই করতে হবে দেশের প্রয়োজন এবং এর অর্থনৈতিক উপযোগিতা বিবেচনায় রেখে। পাশাপাশি অবকাঠামো যাতে টেকসই হয়, সে বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

এই তাগিদ এসেছে অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক থেকে, যার আয়োজন করে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। গতকাল সোমবার রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউর ডেইলি স্টার ভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সহযোগিতা করেছে ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম।

অনুষ্ঠানে অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সরকারি কয়েকটি বড় প্রকল্প নিয়ে কয়েকজন প্রশ্ন তোলেন। তাঁরা বলেন, বড় ব্যয়ে অহেতুক কিছু প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে দেশের অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্‌ফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্নপূরণে অবকাঠামো উন্নয়ন খুবই জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও কোনো দ্বিধা নেই, সে প্রমাণ আমরা পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ অবকাঠামোতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যয় করছে। এ ক্ষেত্রে ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, চীন ও ফিলিপাইন ব্যয় করছে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। উপস্থাপনার শেষ দিকে তিনি কয়েকটি প্রকল্পে ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরে তা যৌক্তিক কি না প্রশ্ন করেন।

মাহ্‌ফুজ আনাম বিভিন্ন দেশ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের অবকাঠামো তৈরিতে অর্থের জোগান কোনো সমস্যা নয়।

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য জামিলুর রেজা চৌধুরী বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে নেওয়া প্রকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগের প্রকল্প ব্যয় হিসেবে চীনা প্রতিষ্ঠান ৬৪০ কোটি ডলার চেয়েছিল। তা দর-কষাকষি করে এখন পর্যন্ত অর্ধেকে নেমেছে। তিনি প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সুদের হার, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি বিষয় মাথায় রাখার পরামর্শ দেন।

জামিলুর রেজা চৌধুরীর বক্তব্যের একপর্যায়ে মাহ্‌ফুজ আনাম জানতে চান, এত দিন পরেও ঢাকার অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কেন সমন্বয় হচ্ছে না? জবাবে জামিলুর রেজা চৌধুরী একটি কৌতুক বলেন, সেটি এ রকম—এক ব্যক্তি গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় রাস্তায় গর্তের মধ্যে পড়েন। এ সময় পাশে বসে থাকা একজন এসে তাঁকে সহায়তা করেন। গাড়ির মালিক খুশি হয়ে তাঁকে কিছু বকশিশ দেন। এরপর জানতে চান, তিনি কী করবেন। ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি গর্তটি ঢেকে রেখে বসে থাকবেন আরেকটি গাড়ির অপেক্ষায়। জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, গর্তটি ওই ব্যক্তিই খুঁড়েছিলেন। সেটা ছিল তাঁর আয়ের উৎস। তিনি চারটি সংস্থার নাম বলেন, যারা ঢাকায় অবকাঠামোর কাজ করছে। সমন্বয়ের দায়িত্ব থাকা সংস্থাকে পাত্তা দিচ্ছে না।

কিছু বড় প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার খরচ করে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা আড়াই শ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেই সম্ভব। পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে কি এটির ব্যবস্থাপনায় সক্ষম? এ সেতু দিয়ে কটি ট্রেন চলবে? এটি করা হচ্ছে, কারণ চীন অর্থায়ন করতে চায়।

আহসান এইচ মনসুর রেলওয়েতে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, বর্তমান রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা এত বড় বিনিয়োগ সামলাতে পারবে না। এর খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। তিনি সাড়ে ৮ টাকা ইউনিটপ্রতি মূল্য ধরে ৩০০ মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার সমালোচনা করেন।

আহসান মনসুর বলেন, ‘সেই সব দেশের কথা চিন্তা করুন, যারা ঋণ সংকটে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা আমাদের কাছের বড় উদাহরণ। চীনাদের ঋণ শোধ করতে না পেরে তাদের মাফ চাইতে হয়েছে।’

ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইএবি) সাবেক সভাপতি শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, হাতিরঝিলের পাশ দিয়ে যে অবকাঠামোটি তৈরি হয়েছে, সেটাকে তারা ফ্লাইওভার বলছে। আসলে এটি অর্থের পুরো অপচয়। এটি দিয়ে ওঠাও যায় না, নামাও যায় না। তিনি প্রকল্প নেওয়ার আগে সেটি দুই তরফে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করার তাগিদ দেন।

আহ্ছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির উপাচার্য এ এম এম শফিউল্লাহ বলেন, বিভিন্ন দেশে শহরের ভেতরে ফ্লাইওভার তৈরির বিষয়টি অনেক আগেই মানা করা হয়েছে।

আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান শেল্‌টেক্‌–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক এম সেরাজ বলেন, ‘রাজধানীতে ফ্লাইওভার নির্মাণেই যদি ভুল হয়, তাহলে দেশের অন্য জায়গায় কী হবে। একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমি লজ্জিত।’

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সালেহউদ্দিন আহমেদ। এতে হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মো. আবু সাদেক, বুয়েটের শিক্ষক সুজিত কুমার বালা, খান মাহমুদ আমানত, সাইফুল আমিন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কার্যালয়ের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আবসর এইচ উদ্দিন, গণপূর্ত বিভাগের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূঁইয়া, বিএসআরএমের বিপণন বিভাগের প্রধান এম ফিরোজ প্রমুখ বক্তব্য দেন।