Home / মতামত / আওয়ামী লীগ ভোট বাড়াচ্ছে না কমাচ্ছে?

আওয়ামী লীগ ভোট বাড়াচ্ছে না কমাচ্ছে?

নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আলোচনার প্রেক্ষাপটে অনেকেই আশা করেছিলেন, নতুন বছরে দেশের রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ ফিরে আসবে। কিন্তু ৫ জানুয়ারি, দশম সংসদ নির্বাচনের তৃতীয় বার্ষিকীতেই পুলিশ ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মিলে শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করে তুলেছেন। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা ১৬ জেলায় বিএনপির মিছিল ও সমাবেশে বাধা দিয়েছেন কিংবা পণ্ড করে দিয়েছেন। এতে শ খানেক বিএনপির নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশ ১৫ জনকে আটক করলেও বিএনপির সমাবেশে আওয়ামী লীগের যেসব নেতা-কর্মী হামলা চালিয়েছেন, তাঁদের কেউ গ্রেপ্তার হননি। এরপর বিএনপি পাল্টা কর্মসূচি নিলে সরকার হয়তো কঠোর হাতে দমন করবে। কিন্তু দমন–পীড়ন তো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ছাত্রলীগ গত দুই দিনে ঢাকায় তিনটি সমাবেশ করলেও সরকার বিএনপিকে কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি। সংঘাত এড়াতে দলটি ৫ জানুয়ারির পরিবর্তে ৭ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার অনুমতি চেয়েছিল। এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়া হয়নি। ১ জানুয়ারি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ‘ঘরোয়া সমাবেশ’ করে যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তাতে একধরনের যুদ্ধপ্রস্তুতির ইঙ্গিত রয়েছে। অতীতে রাজপথের আন্দোলনে শরিক না হওয়ায় তিনি ছাত্রদল নেতাদের ওপর ক্ষোভ ঝেড়েছেন। জানতে চেয়েছেন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া বিএনপির ১৩ দফা দাবিনামা কজন পড়েছেন। ছাত্রদল কিংবা ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে এখন পড়াশোনার চেয়ে নেতা-নেত্রীদের বন্দনা করা অনেক বেশি জরুরি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে অনুপ্রবেশকারী ও পরগাছামুক্ত করার কথা বলেছেন। কম্বল বাছতে গিয়ে না গা উজাড় হয়ে যায়।
৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের চত্বরে দুটি পৃথক সমাবেশ থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যা বলেছেন, তার সারমর্ম হলো, আগামী নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। তাঁরা বলেছেন, ক্যান্টনমেন্ট থেকে কেউ এসে বিএনপি চেয়ারপারসনের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে না। নির্বাচনই ক্ষমতায় যাওয়ার একমাত্র পথ। আওয়ামী লীগের নেতারা বক্তৃতায় বিএনপি ও তাদের নেত্রীর পেছনে যত বাক্য ব্যয় করেছেন, তার সিকি ভাগও নিজ দলের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা নিয়ে ব্যয় করেননি।
সরকারের মেয়াদ ইতিমধ্যে তিন বছর পার হয়েছে। বাকি আছে দুই বছর। আইন অনুযায়ী সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে আরও তিন মাস কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনী হাওয়া থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু হাওয়াটা দ্বিমুখী নয়, একমুখী। সরকারি দল সভা-সমাবেশ করে নৌকার পক্ষে ভোট চাইছে। এমনকি সাবেক স্বৈরাচার এরশাদও আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখছেন। কিন্তু বিএনপিকে সভা–সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের নেতারা একদিকে বিএনপিকে নির্বাচনে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার তাদের সভা-সমাবেশ করতে দিচ্ছে না।

এটি কেবল স্ববিরোধী নয়, সংবিধানেরও পরিপন্থী। ৭ নভেম্বর উপলক্ষে বিএনপি সমাবেশ করতে চেয়েছিল। সরকার অনুমতি দেয়নি। উল্টো মন্ত্রী-নেতারা বিএনপির রাজপথে থাকার মুরদ নেই বলে উপহাস করছেন। তাহলে কি আওয়ামী লীগই চাইছে বিএনপি আবার হরতাল-অবরোধের রাজনীতিতে ফিরে যাক? কিন্তু তাতে ক্ষমতাসীনদের আত্মপ্রসাদ লাভের সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে হরতাল-অবরোধের কারণে কোনো দলের জনসমর্থন কমে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলই প্রতিযোগিতা করে হরতাল পালন করে পরেরবার ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত করেছে। মানুষ হরতালকে খারাপ মনে করে ঠিক, তার চেয়েও বেশি খারাপ মনে করে গায়ের জোরে বিরোধী দলের সভা–সমাবেশ করতে না দেওয়াকে।
আগে যাই-ই করুক না কেন, এখন তো বিএনপি বলছে তারা হরতাল করতে চায় না, অবরোধ ডাকতেও অনাগ্রহী, কেবল সভা-সমাবেশ করে তাদের কথা জনগণকে জানাতে চায়। কিন্তু নানা অজুহাতে সরকার সেই সুযোগটুকুও দিচ্ছে না। মানুষ দেখছে সরকারি দল রাস্তা বন্ধ করে জনগণের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে নিয়মিত সমাবেশ ও মিছিল করছে, কিন্তু বিরোধী দলকে পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের মিছিলের কারণে ঢাকা শহরে জনদুর্ভোগ হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি অন্তত জনগণের দুর্ভোগের কথাটি স্বীকার করেছেন। কিন্তু বরিশালে তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা বিএনপির একজন নারী নেত্রীর ওপর যে নৃশংসতা দেখিয়েছেন, তার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা তিনি নেবেন কি? সেখানকার বিএনপির নেতা-কর্মীরা যদি কর্মসূচি পালনের নামে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে থাকেন, তা মোকাবিলার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর চড়াও হবেন কেন? বিরোধী দল এই মাস্তানি করলে কী তাঁরা ছেড়ে দিতেন?
সাধারণ মানুষ সামনের রাজনৈতিক দৃশ্যপটটি এমন চায় যে কোনো হাঙ্গামা হবে না, সবকিছু সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে চলবে, নির্বিঘ্নে যে যার কর্মসূচি পালন করবে, কেউ বাধা দেবে না। তারা চায় যে হরতাল অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও কিংবা গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু সরকার যদি বিরোধী দলকে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করতেই না দেয়, তখন তো রাজনীতি সুস্থ ও স্বাভাবিক পথে চলবে না।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা দেশের প্রভূত উন্নয়ন করেছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়িয়েছে, মূল্যস্ফীতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টেও সরকারের সাফল্যের কথা আসছে (আবার কোনো কোনো রিপোর্টে ব্যর্থতার চিত্রও আছে)। এত সব সাফল্য সত্ত্বেও সরকার তাদের ভাষায় জনগণ দ্বারা ‘পরিত্যক্ত’ বিএনপিকে কেন ভয় পাচ্ছে? কেন তাদের সভা-সমাবেশ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে? বিরোধী দলের প্রতি সরকার কী ধরনের আচরণ করছে, তার নিরিখেই বিচার করা হয় তারা কতটা গণতান্ত্রিক। এ ব্যাপারে আমাদের অতীত রেকর্ড খুবই খারাপ। বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে এমন কোনো চণ্ড নীতি নেই, যা বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে নেয়নি। তার আগে আওয়ামী লীগ সরকারও একই আচরণ করেছে বিএনপির প্রতি। স্বাধীনতার পর ৪৫ বছর ধরেই এই সাপ-বেজি খেলা চলছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা গর্ব করে বলে থাকেন, তাঁদের দলটি জনগণের ভেতর থেকে উঠে আসা দল এবং বিএনপি সামরিক শাসনের গর্ভে জন্ম নেওয়া দল; অতএব এই দুটি দলের মধ্যে তুলনা হতে পারে না। মানলাম। দুই দলের মধ্যে জন্মগত ফারাকটির প্রতিফলন কিন্তু কাজকর্মে খুব একটা দেখা যায় না। ‘সাম্প্রদায়িক’ বিএনপির শাসনামলে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে। এখনো হচ্ছে। বরং বিএনপি আমলে যখন এসব অঘটন ঘটছিল, মানুষ মনে করত, আওয়ামী লীগ এলে তারা সুরক্ষা পাবে। কিন্তু কয়েক বছরে সংখ্যালঘুরা যেভাবে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ ও নিগৃহীত হচ্ছে, যেভাবে তাদের বাড়ি–ঘরে হামলা হচ্ছে, তাতে ভরসা রাখার কোনো জায়গা থাকল না। নাসিরনগরে ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা ও ইউপি চেয়ারম্যানই সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর–মন্দিরে হামলায় ইন্ধন জুগিয়েছেন। তাহলে বিএনপির সঙ্গে ‘সেক্যুলার’ আওয়ামী লীগের ফারাকটি আর থাকল কই? ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগে জামায়াতীকরণ হচ্ছে।’

ঐক্য ন্যাপের আহ্বায়ক পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘বর্তমানে আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখতে পারছেন না, মোশতাকের ছায়া দেখতে পারছেন।’ ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে এখন শেখ হাসিনাই একমাত্র পার্থক্য।’ ব্যক্তি দিয়ে দলের চরিত্র নির্ধারিত হয় না, হয় নীতি ও আদর্শ দিয়ে।
আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপির বিরুদ্ধে আগুন–সন্ত্রাস, বোমা মেরে মানুষ খুন করার অভিযোগ এনেছেন। আন্দোলনের নামে এসব ঘটনা ঘটেছে, তা–ও অস্বীকার করা যাবে না। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় অজ্ঞাতনামা শত শত আসামির সঙ্গে হুকুমদাতা হিসেবে বিএনপি নেতাদের নাম এসেছে। কিন্তু যাকে তাঁরা হুকুম দিলেন, তাঁকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না। একটি মামলা তখনই বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, যখন প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়ে নকল আসামি খোঁজা হয়।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় জজ মিয়ার কাহিনি আমরা ভুলে যাইনি। সেটি ঘটেছিল বিএনপি আমলে। ক্ষমতাসীনদের কারও কারও মদদে ও প্রশ্রয়ে জঙ্গিগোষ্ঠী পরিচালিত এই নৃশংস হত্যা ও হামলাকে তৎকালীন সরকার আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধের ফল এবং প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা পলাতক সন্ত্রাসীদের কাজ বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সত্য আড়াল করা যায়নি। আন্দোলনের নামে বিএনপি নেতারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকলে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার আইনি ব্যবস্থা নিক। কেউ আপত্তি করবে না। কিন্তু হুকুমের আসামি হিসেবে কারও কারও বিরুদ্ধে ৭০–৮০টি মামলা করা রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং বিএনপির প্রতি মানুষের সহানুভূতি বাড়াবে।
সরকার যদি আইনের শাসন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তাহলে বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে দিতে হবে। আওয়ামী লীগ তাদের শাসনামলের উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা দেশবাসীকে জানাবে। বিরোধী দল সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরবে। এরপর জনগণই ঠিক করবে তারা কাকে বেছে নেবে। আওয়ামী লীগে অনেক অভিজ্ঞ ও পোড় খাওয়া রাজনীতিক আছেন। বিরোধী দলে থাকতে তাঁরা একাধিকবার জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, বিরোধী দলকে সভা–সমাবেশ করতে না দিয়ে এবং প্রত্যহ বিএনপিকে গালাগাল করে আপনারা আওয়ামী লীগের ভোট বাড়াচ্ছেন, না কমাচ্ছেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

Facebook Comments