মন্ত্রী সাংবাদিকের শিরোনাম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু এক হাজার কর্মকর্তার আনন্দ ভ্রমণ নিয়ে আপত্তি করেন না

188

প্রভাষ আমিন: সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল কর্মসূচির আওতায় হাতেকলমে দেখতে এক হাজার কর্মকর্তার বিদেশ যাওয়ার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এটি ফাঁস হয়ে গেলে গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল হইচই। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। আর এতেই ক্ষেপেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন।

তার সব ক্ষোভ সাংবাদিকদের ওপর। কারণ সাংবাদিকরা তার মন্ত্রণালয়ের অপকর্ম ফাঁস করে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি নিয়ে হইচই করার কিছু নেই। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা মাইন্ড করবেন না, আপনাদের এই সাংবাদিকতায় কিছু বিএনপি-জামায়াতের লোকজন এখানে আসছেন। তাদের কোনো জ্ঞান গরিমা নেই, একটা হুট করে লিখে দিলেই বোধহয় হয়ে গেলো। সরকারের ভাবমূর্তি কোথায় গেলো না গেলো এরা তা দেখে না। আপনাদের অনুরোধ করবো, এই সমস্ত জামায়াত-বিএনপির সাংবাদিক, নতুন নতুন তারা সাংবাদিকতায় আসছে। আমার এলাকায় দেখছি সমস্ত বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলের ছেলেরা এখন সাংবাদিকতা করে ভ্রান্ত রিপোর্ট করে, এদিক থেকে আপনারা একটু নজর রাখবেন। আমাদের সরকারের যেন বদনাম না হয়।’

কী হাস্যকর বক্তব্য। প্রকাশিত রিপোর্ট ঠিক আছে না ভুল, প্রতিমন্ত্রী সেটা নিয়ে কথা বলতে পারেন, সাংবাদিকদের নিয়ে এভাবে ঢালাও কথা বলার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? মানছি প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিছুটা অতিরঞ্জন ছিলো। প্রকল্পটি সামগ্রিকভাবে মিড ডে মিল সম্পর্কে হাতেকলমে জ্ঞান অর্জনের জন্য। খিচুরি রান্না সেখানে একটি ছোট্ট উপাদান মাত্র। কিন্তু পত্রিকায় এসেছে, একহাজার সরকারি কর্মকর্তা খিচুরি রান্না শিখতে বিদেশে যাচ্ছেন, যার বাজেট ৫ কোটি টাকা। তারপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলের বন্যা। মন্ত্রী রিপোর্টের শিরোনাম নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু মিড ডে মিল দেখতে এক হাজার কর্মকর্তার বিদেশ যাওয়ার প্রস্তার তো বায়বীয় নয়। এই প্রস্তাব ছিলো এবং বাতিল হয়েছে।

শিরোনাম নিয়ে মন্ত্রী আপত্তি করতে পারেন বটে, কিন্তু বাংলাদরশের প্রায় সকল প্রকল্পে একটা বিদেশ সফর তো মাস্ট। অধিকাংশ ট্যুরই তো আসলে প্লেজার ট্রিপ। পুকুর কাটা শিখতে বিদেশ যাওয়ার রেকর্ডও আছে নদীমাতৃক এই বাংলাদেশেই। এভাবে দলে দলে বিদেশে না গিয়ে কিছু যদি শিখতেই হয়, বিদেশ থেকে দুয়েকজন বিশেষজ্ঞকে বাংলাদেশে এনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিলেই তো হয়। জনগণের করের টাকায় বিদেশে আনন্দ ভ্রমণ চলতে পারে না। দাবি জানাচ্ছি, অতি জরুরি এবং অবশ্যম্ভাবী ছাড়া সব ধরনের বিদেশ সফর বাতিল করা হোক। বরং সময় এসেছে অন্য দেশ থেকে মানুষ বাংলাদেশে এসে শিখবে আমাদের কৃষকদের সাফল্য।

মাননীয় প্রতিমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন, সেটা যদি সত্যি হয়ও, তাতে তো দোষের কিছু নেই। অতীতে বিএনপি-জামায়াত করলেই তিনি সাংবাদিকতা করতে পারবেন না, এমন তো কোনো কথা নেই। বরং সাংবাদিকদের বেশির ভাগই সচেতন এবং ছাত্রজীবনে কোনো না কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করেছেন, এমন অনেক সাংবাদিকের নাম আমি প্রতিমন্ত্রীকে দিতে পারবো। তাদের ব্যাপারেও কি মন্ত্রী আপত্তি করবেন? অতীতে কে, কী করতেন; অন্তত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সেটা বিবেচ্য নয়। সেই সাংবাদিক তার পেশাগত জীবনে কতোটা পেশাদার সেটা হলো প্রধান। তিনি যে রিপোর্ট করেছেন, সেখানে কোনো বিচ্যুতি আছে কিনা সেটা হলো বিবেচ্য।প্রতিমন্ত্রী এই রিপোর্টের ক্ষেত্রেও সেটা নিয়ে কথা বলতে পারতেন। তা না করে তিনি বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়েই দোষ চাপানোর পুরোনো কার্ড খেললেন। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী নিজেদের অপকর্ম বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে চাপিয়ে পার পাওয়ার দিন শেষ। আপনারা ১২ বছর ক্ষমতায় আছেন, বিএনপি ১৪ বছর আগে ক্ষমতায় ছিল।

এখন আর কোনো কিছুর দায় তাদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করলে মানুষ বিশ^াস করবে না, হাসবে। এখন যাদের বয়স ২০, যাদের ভোট দেয়ার বয়স হয়েছে, তারা বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখেইনি। না দেখা এক জুজুর ভয় দেখালে তারা মানবে কেন?তবে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী সবচেয়ে হাস্যকর কথা বলেছেন সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে। বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা সাংবাদিকরা নাকি যা ইচ্ছা তাই লিখে দেয়, সরকারের ভাবমূর্তি কোথায় গেলো না গেলো তা দেখে না। তিনি সরকারের যাতে বদনাম না হয় সেটা দেখার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, আমি বিনীতভাবে বলতে বাধ্য হচ্ছি, সাংবাদিকতা সম্পর্কে আপনার জ্ঞান-গরিমা শূন্যের কোঠায়।

প্রথম কথা হলো, সাংবাদিকতা একটি উন্মুক্ত পেশা। যে কেউ নিয়ম, নীতি-নৈতিকতা মেনে সাংবাদিকতা করতে পারেন। দ্বিতীয় কথা হলো, সরকারের ভাবমূর্তি দেখার দায়িত্ব সাংবাদিকদের নয়। সাংবাদিকদের কাজ সত্য তুলে ধরে। তাতে কার ভাবমূর্তি কোথায় গেলো সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। অকারণে বিদেশে গেলে, লুটপাট করলে, দুর্নীতি করলে আর মিডিয়ার সামনে প্রতিমন্ত্রীরা হাস্যকর কথা বললেই সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়; সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশে নয়।