ভারতের আগ্রাসনের জবাব দিতে চীন নিয়ে নতুন ‘দক্ষিণ এশিয় সংস্থা’ গঠনের সময় হয়েছে

203

মনে হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উদ্বিগ্ন দেশ এখন ভারত। এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর উত্থানের কারণে ভারতের গতানুগতিক প্রভাবটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেছে। এটা ১৯৪৭ সাল নয়, যখন ভারতের জন্ম হয়, এটা ১৯৭১ সালও নয়, যখন ভারত এ অঞ্চলকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছিল।

১৯৭১ যদিও একটা গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল, কিন্তু একটা পরিবর্তনেরও শুরু হয়েছিল তখন। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল এবং সেটা এই অঞ্চলে পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনটা এখন সামান্য গন্ধ থেকে প্রবল দুর্গন্ধে রূপ নিয়েছে এবং গত দশকে এটার তীব্রতা আরও বেড়েছে।

ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো আগে সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশান ফর রিজিওনাল কোঅপারেশান (সার্ক) গঠন করে সেটাকে কার্যকরের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ভারত প্রতিষ্ঠানটিকে শেষ করে দিয়ে বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশানকে (বিমসটেক) পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। কিন্তু সেটা দক্ষিণ এশিয় ব্র্যাণ্ড নয়। দক্ষিণ এশিয়ার সম্মিলিত প্রতিনিধিত্ব আর কোথাও নেই।

এই ‘সঙ্কটের’ প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে চীনের নাটকীয় উত্থান এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে তাদের প্রভাব। প্রত্যেকেই মুক্ত হতে চেয়েছে এবং সবাই সেই পরিবর্তনটা আনার জন্য উৎসাহী হয়ে চীনকে কাজে লাগাতে চেয়েছে। একটা নতুন দক্ষিণ এশিয়ার উদ্ভব হয়েছে এখন, যে দক্ষিণ এশিয়া পুরনো ধরনের আধিপত্য আর চায় না, ভারত যেটা বহুদিন উপভোগ করে এসেছে। সার্ককে অকার্যকর করে ফেলাটা খুবই সহজ ছিল কারণ এটা ছিল একটা দুর্বল সংস্থা।

টেলি কূটনীতির উত্থান

বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর ইমরান খানের টেলি-কথপোকথন যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে বেশি পেয়েছে। এর কারণ হলো ভারত আর পাকিস্তানের মিডিয়া। ভারত নিরাপত্তাহীনতায় আছে, আর পাকিস্তান আছে তৃপ্তিতে। বাংলাদেশে এই টেলিফোন আলাপ প্রায় কোন ঢেউই তোলেনি। কারণ বাংলাদেশীদের মানসিকতার জায়গা থেকে পাকিস্তান অনেক দূরে। যে কোন বিচারে হাসিনার জন্য পাকিস্তান-পন্থী অবস্থান নেয়াটা পুরোপুরি প্রশ্নের বাইরে। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবস্থানের ভিত্তিটাই হলো পাকিস্তান-বিরোধিতা। ভারতীয় মিডিয়ার একটি অংশ ছেলেমানুষির মতো সরকারের উপদেষ্টা সালমান রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, তিনি পাকিস্তানপন্থী নীতির পরিকল্পনা করছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যাপারে এই সীমিত জ্ঞানের কারণেই ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ভারতের বেশ কিছু গ্রুপ রয়েছে, যাদের মধ্যে ঘাতক দালাল কমিটিও রয়েছে, যারা ১৯৭১ সালের অপরাধীদের বিচারের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু গত মাসে যখন চীন-ভারত উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার হঠাৎ সফর নিয়ে যখন নানান জল্পনা চলছিল, তখন জনগণের মনোভাবে পরিস্কারভাবে ভারতবিরোধী ছিল।

শেখ হাসিনা নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সাথেও কথা বলেছেন, কিন্তু এটা ছিল সার সরবরাহ নিয়ে। এটা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু একটি বিষয় ভারত বুঝতে পারছে না। পাকিস্তানের মতো ভারতও কাশ্মীর, সীমান্ত সঙ্ঘাতের ব্যাপারে আসক্ত এবং উভয়েই একে অন্যের ধ্বংস কামনা করছে। অন্যান্য ইস্যুগুলোকে এখানে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাকি অংশে অগ্রাধিকারটা ভিন্ন। এই দেশগুলো অর্থনীতির প্রতি মনোযোগী, অন্য দিকে নয়। ভারত রাজনীতি চায় এবং পাকিস্তান-মুক্ত দক্ষিণ এশিয়া গড়তে চায়। যেভাবে তারা মুসলিম সংখ্যালঘু কার্ড খেলছে, সেখানে বোঝা যায় তারা এমন ধরনের রাজনীতি খেলছে, এটা দেশে এবং এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে।

পুরনো ধরনের রাজনীতির খেলা

দক্ষিণ এশিয়া এ ব্যাপারে আগ্রহী নয়, কারণ অনেকটা অস্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তান আর ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশগুলো ঘৃণার রাজনীতির স্তর পেরিয়ে গেছে। আর এটাই একটা বড় পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। ভারত আর পাকিস্তান রাজনৈতিক চোরাবালিতে আটকে আছে যেটা বাকিদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আর এই প্রেক্ষাপটেই দৃশ্যপটে এসেছে চীন।

চীন অর্থনৈতিক সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে এবং ঋণের ফাঁদের বিপর্যয়ের গল্প দক্ষিণ এশিয়ায় কোন প্রভাব ফেলেনি। বাংলাদেশের মতো দেশ – যেখানে ভারত এবং এমনকি মিয়ানমারের মতো দেশের দিক থেকে সার্বভৌমত্বের হুমকি খুব সামান্যই অর্থ বহন করে, সেখানে কোন ধরনের বিতর্ক ছাড়াই বিআরআই (বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিষিশয়েটিভ)-কে স্বাগত জানানো হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ চীনসহ কারো বিরুদ্ধেই যুদ্ধে যাবে না। তাদের একমাত্র প্রয়োজন হলো বিনিয়োগ আর চীন সেই বিনিয়োগে আগ্রহী। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বাংলাদেশের উপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু চীন অনেক দূরে এবং তাদের উইঘুর নীতি অনেক বাংলাদেশের মাথায় থাকলেও অধিকাংশের চিন্তাতেই নেই। চীন বাণিজ্যের অংশীদার এবং ভারতের মতো ‘আজীবনের’ অংশীদারও তারা নয়।

এই মৌলিক পার্থক্যের কারণে সার্ক আর বিমসটেক দুটোই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নতুন একটি ব্যবস্থা দরকার। আর এতে চীনকেও হয়তো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কারণ যোগাযোগের কারণে চীনও এখন কার্যত দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হয়ে উঠেছে।

দক্ষিণ এশিয়া নিজেও সেটা বুঝতে পারছে। পুরনো বিশ্ব পালটে গেছে কিন্তু মনে হচ্ছে ভারত এখনও নতুন বিশ্বের বাস্তবতা বুঝে উঠতে পারেনি।