Breaking News
Home / রাজনীতি / ওয়ান ইলেভেনের সাথে দিল্লী কানেকশান ছিল -আলীগ নেতা

ওয়ান ইলেভেনের সাথে দিল্লী কানেকশান ছিল -আলীগ নেতা

আওয়ামী লীগের গবেষণা সেলের দায়িত্বে থাকা এক সময়ের শেখ হাসিনাঘনিষ্ট নেতা মোনায়েম সরকার এক-এগারো, দিল্লী কানেকশান ও শেখ হাসিনা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন । তার সদ্য প্রকাশিত বই থেকে —

“… ওয়ান-ইলেভেনের গণবিস্ফোরণের পর শেখ হাসিনা তখন কারারুদ্ধ। ওরা কিভাবে টেনেহিঁচড়ে তাকে তুলে নিয়ে যায় সে দৃশ্য টেলিভিশনের মাধ্যমে অনেকের মতো আমিও দেখেছি। তার থেকে ভয়ানক বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির ধারা ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে তখন। উচ্চাভিলাষী অনেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন বাংলার মসনদে গদিনশীন হওয়ার। সে দলে আওয়ামী লীগ, বিএনপির নেতারা তো আছেনই, আছেন বাইরের হোমরা-চোমরারাও।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারাও বেশিরভাগ তখন সংস্কারপন্থী। সে দলের বাইরে জিল্লুর রহমান এবং মতিয়া চৌধুরী। তখনও তোফায়েল সাহেব সম্পর্কে নি:সন্দেহ নই আমরা। তাকে মধ্যপন্থী বলে মনে হচ্ছে আমার। সে সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলেন তোফায়েল ভাই। তাকে দেখতে গেলেন জিল্লুর রহমান, গেলেন মতিয়া চৌধুরী। আর নিশ্চিত হওয়া গেল তিনি আছেন আমাদের সঙ্গে।

সে সময় শেখ হাসিনার মুক্তির বিষয়ে নানারকম খবর শোনা যেত। প্রখ্যাত সাংবাদিক গাফফার চৌধুরী আমাকে বলেছিলেন, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় তাকে বলেছেন, ঈদের পর তিনি ছাড়া পাবেন। ব্যাপারটা যাচাই করবার একটা সুযোগ পেলাম আমি। ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিদায়ী ভোজে। সেখানে মোস্তফা ফারুক মাহমুদ ছিলেন, তিনি ভারতে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। আমি তাকে মি. চক্রবর্তীর কাছে জিজ্ঞাসা করতে বললাম খবরটা কতদূর সত্যি।

পিনাক বললেন, ‘না, না।’

‘আপনাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন।’

‘তাহলে ফিফটি ফিফটি।’

কিন্তু ঈদ চলে গেল ছাড়া পেলেন না তিনি। প্রণব মুখার্জী যদি কথাটা বলে থাকেন, তাহলে তা ঠিক হলো না। আর আমরা খবর পেলাম, শেখ হাসিনাকে জেলের ভেতরে হত্যা করা হতে পারে।

খবরটা শুনে খুব ঘাবড়ে গেলাম। কী করা যায়। ঠিক হলো আমি এদিক থেকে কলকাতা যাব আর গাফফার চৌধুরীও আসবেন লন্ডন থেকে। বঙ্গবন্ধুর ওপর ছবি তৈরি এবং শেখ হাসিনার মুক্তির ব্যাপারে আমরা মনমোহন সিং-এর সঙ্গে কথা বলব। এপ্রিলের শেষে সেই মতো আমি কলকাতা গেলাম কিন্তু গাফফার চৌধুরী এলেন না। হতাশ হয়ে ফিরে আসব, তখন বাংলা স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক মানস ঘোষ বললেন, ‘দাদা এসেছেন যখন দিল্লিটা ঘুরে যান।’ তিনিও শেখ হাসিনার মুক্তির ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন।

পঁচাত্তর-পরবর্তীকালের প্রেক্ষাপটে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু তাদের প্রায় সবাই তখন প্রয়াত। মারা গেছেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, পি এন হাকসার। প্রণব মুখার্জীর ঙ্গে আমার কখনোই তেমন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তবু আমি দিল্লি গেলাম। উঠলাম বঙ্গভবন সরকারি রেস্ট হাউসে (পশ্চিমবঙ্গ হাউস)। চেষ্টা করলাম প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি তখন ইরানের রাষ্ট্রদূতকে নিয়ে ব্যস্ত। তার ব্যক্তিগত সচিব পরামর্শ দিলেন কলকাতায় গিয়ে দেখা করতে। তখন ভাবনায় পড়ে গেলাম আর মনে পড়ল একজনের কথা। মুচকুন্দে দুবে। এক সময় তিনি বাংলাদেশে হাইকমিশনার ছিলেন। তার সঙ্গে পরিচয় তিনি যখন যুগ্ম সচিব তখন। বাংলাদেশ ডেস্ক দেখতেন তিনি। বিশ্ব শান্তি পরিষদের রমেশ চন্দ্রের সহধর্মিণী পেরিন রমেশ চন্দ্র তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। শ্রী দুবের রিসার্চ অফিসের পাশে একটা ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের রেস্তোরাঁয় আমরা বসলাম। সেখানে তাকে সব জানিয়ে বললাম, ‘আমি এখানকার আর কাউকে চিনি না। এ অবস্থায় আপনি কী করতে পারেন।’

তিনি বললেন, ‘দেখো তোমরা বলছো যে, এ পক্ষে, ও বিপক্ষে এটা ঠিক না। আসল কথা হচ্ছে, সিকিউরিটি এডভাইজার নারায়াণন একটা তত্ত্ব দিয়েছেন। তিনি বলছেন, আমরা পাকিস্তান আর্মি, বার্মার আর্মির সঙ্গে ডিল করি। সেরকম বাংলাদেশের আর্মির সঙ্গেও ডিল করব। বাংলাদেশ কী দিয়েছে আমাদের? বাংলাদেশের কথা আর আলাদা ভাবে ভাবার কিছু নেই। এই তত্ত্বটা বদলাতে হবে।’

বললাম, ‘আমি তো কাউকে চিনি না। কার সঙ্গে কথা বলব?’

তার সাফ জবাব, ‘সে আমি জানি না।’

আমি তখন দেব মুখার্জীকে (বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার) ফোন করে বললাম, ‘কী করি, আই কে গুজরালকে বললে কিছু হবে?’

তিনি বললেন, ‘হতে পারে।’

টেলিফোন নম্বরও তিনি দিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল ৫ জনপদ রোডে থাকতেন। তাকে ফোন করলে তার পিএ বললেন, ‘আপনার পরিচয় কী?’

কী পরিচয়ে তিনি তুষ্ট হবেন সে একটা সমস্যা বটে। একটা স্মৃতি অবশ্য আছে। ‘ইন্টারন্যাশনাল টেররিজম’ সম্মেলন যখন হয়, আই কে গুজরাল তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে গিয়েছিলাম। সে সময় আই কে গুজরাল হায়দ্রাবাদ হাউজে বিদেশি অতিথিদের সম্মানে ডিনারের আয়োজন করেন। সেখানে তার একপাশে বসেছিলেন পাকিস্তানের ওয়ালী খান আর একপাশে বসেছিলাম বাংলাদেশের আমি। সে সময় অনেক কথা হয়েছিল তার সঙ্গে। ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়ে। তিনি কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন। কাজও হয়েছিল তাতে। সে কথা মনে করিয়ে দিলাম আমি। আই কে গুজরালের পিএ বললেন, ‘আগামীকাল বিকাল পাঁচটায় জনপদ রোডের ৫ নম্বর বাড়িতে চলে আসুন।’

বঙ্গভবন থেকে এক ঘন্টা আগে বের হয়েই স্কুটার পেয়ে যাই আমি। সাড়ে চারটায় পৌঁছে যাই জনপদ রোডে। গেটে পরিচয় পেয়েই আমাকে ভেতরে ঢুকতে দিল দ্বাররক্ষী। আমি ভেতরে গিয়ে বললাম, ‘আমার আসার কথা ছিল ৫টায়। আমি আগেই পৌঁছে গেছি।’

তাতে কিছু অসুবিধা হলো না। আই কে গুজরাল তখনই আমাকে সাক্ষাৎ দিলেন। বললেন, ‘দেখ, হাসিনার বিরুদ্ধে নানা কথা। সিনিয়ররা বলে তিনি তাদের বিশ্বাস করেন না। গতবার যখন আমি রেহমান সোবহানের সেমিনারে গিয়েছিলাম, তখন তাকে বলেছিলাম গ্যাস উত্তোলন করুন দেশের জন্য, তিনি বললেন, পরের বার ক্ষমতায় এসে করবো।’

তিনি নিজেই নানা কথা বলে চললেন। শেষে একটু সুযোগ করে নিয়ে বললাম, ‘আমি আপনার কাছে এসেছি একটা বিশেষ কারণে। আমাদের কাছে এ রকম খবর এসেছে, তাকে জেলের ভেতর হত্যা করা হবে আমাদের দেশের চার নেতার মতো।’

তিনি বললেন, ‘Look, look, we are prepared to do everything for Bangladesh except sending Indian Army. ঠিক কি চাইছো তুমি বল।’

‘শেখ হাসিনার জীবন বাংলাদেশেই নিরাপদ নয়। জেলে বা জেলের বাইরে কোথাও নয়। তাকে মুক্ত করে দেশের বাইরে পাঠাতে হবে। এটা যদি সোনিয়া গান্ধী বা মনমোহন সিং-কে একটু বলেন।’

‘আমাকে ওরা অবশ্য মাঝে মাঝে ডিনারে ডাকে।’

‘এত দেরি হলে হবে না। যে কোনো সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে।

তিনি বললেন, ‘Let me see, what can I do’.

সেখান থেকে বেরিয়ে আমি ‘মেইন স্ট্রিম’ পত্রিকার সম্পাদক সুমিত চক্রবর্তীকে বললাম, ‘একটু দেখো ব্যাপারটা। গুজরালজীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখো।’

মুচকুন্দ দুবেকেও জানালাম সব। তিনি বললেন, ‘ভালো করেছ। কাজ হতে পারে।’

দেশে ফেরার ৪-৫ দিন পর মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ আমাকে বললেন, ‘আরে মোনায়েম, তোমার ভ্রমণ সফল। আই কে গুজরাল মনমোহন সিং-এর সঙ্গে কথা বলেছেন।’

জানতে চাইলাম, ‘সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও কথা হয়েছে কি?’

‘সেটা জানি না।’

মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ পরে জানিয়েছেন, প্রণব মুখার্জী, মনমোহন সিং, সোনিয়া গান্ধী সবাই বসে আলোচনা করে ঠিক করেন যে তারা কিছু বললে সেটা সরকারি পর্যায়ে চলে যায়। বরং গুজরালজী বললে ভালো হয়। তখন গুজরালজী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান ফখরুদ্দীনকে ফোন করে বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলা হতে পারে। আমরা চাই, তাকে ছেড়ে দিয়ে দেশের বাইরে পাঠানো হোক।’

ব্যাপারটা নিশ্চয়ই এত সহজ ছিল না। আরও অনেক কিছু এর সাথে যুক্ত থাকাটাই স্বাভাবিক। তবু ঘটনা হচ্ছে যেভাবেই হোক কিছুদিনের ভেতর শেখ হাসিনা ছাড়া পেয়ে লন্ডন গেলেন।

এদিকে গাফফার চৌধুরীর সঙ্গে ফোনে নিয়মিত আলাপ হয় আমার। কথা থাকা সত্ত্বেও তার কলকাতা না যাওয়ার বিষয়ে তাকে যখন বললাম, ‘আপনি এটা কী করলেন? এলেন না।’

‘আপনি শেখ হাসিনাকে বলেন আই কে গুজরালকে ফোন করে একটু ধন্যবাদ জানাতে। তিনি অনেক করেছেন।’

পরদিন গাফফার চৌধুরী জানতে চাইলেন, ‘দাওয়াত দিলে আই কে গুজরাল কি লন্ডনে আসবেন?’

আমি তখন ফোন করলাম সুমিত চক্রবর্তীকে। তিনি জানালেন, ‘আর কারও বলা ঠিক হবে না। লন্ডন থেকে কেউ ফোন করুক।’

গাফফার চৌধুরী আমাকে জানান যে, শেখ হাসিনা আই কে গুজরালকে ফোন করেছেন। তিনি আরও জানান, প্রণব মুখার্জী তাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন, ‘তোমরা যে গুজরালকে নিতে চাও সেটা কী আওয়ামী লীগ থেকে?’ আর তিনি জানিয়েছেন যে, না বঙ্গবন্ধু রিসার্চ সেন্টার থেকে।

আই কে গুজরাল লন্ডন গিয়েছিলেন। তবে সেই মুহুর্তে শেখ রেহানার ছেলের বিয়ে উপলক্ষে শেখ হাসিনা লন্ডনের বাইরে ছিলেন। তাই বঙ্গবন্ধু রিসার্চ সেন্টারের সেমিনার হতে পারেনি। তবে পরে হোটেলে দেখা হয়েছে বলে গাফফার চৌধুরী আমাকে জানিয়েছেন॥”

  • মোনায়েম সরকার / আত্মজৈবনিক ॥ [ ভাষাচিত্র – ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ । পৃ: ২৬৪-২৬৮ ]
Facebook Comments
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.