শূন্য থেকে কোটিপতি বাংলাদেশি ওয়াহিদুর

9

১৯৯১ সালে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার সময় মনস্থির করেন তখনকার উঠতি অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় যাবেন। উদ্দেশ্য ছিলো কিছু অর্থকড়ি উপার্জন করে দেশে ফিরে নিজেকে পরিবার ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা।

আর সেই বিদেশে পাড়ি জমানো যুবকটির নিখাদ চাওয়া বদলে দিয়েছে কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রামের মো. ওয়াহিদুর রহমানের জীবন। বিদেশ বিভূঁইয়ে মেধা আর কঠোর শ্রমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনন্য উচ্চতায়। এখন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের আদর্শ তিনি।

কেননা, যেখানে একদিন শূন্য হাতে এসেছিলেন সেখানেই আজ বাড়ি-গাড়ি, যশ-খ্যাতি সবই আছে তার। নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশি কমিউনিটিতেও। কাজ করে যাচ্ছেন প্রবাসীদের কল্যাণে।

সম্প্রতি বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে ওয়াহিদুর তুলে ধরলেন প্রবাস জীবনে নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা।

জানালেন, প্রথমে মালয়েশিয়ায় এসে চাকরি করে শুরু করেন প্রবাস জীবন। তবে প্রথম দিকের দিনগুলো বেশ সুখকর ছিলো না। এরপরও নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৯১ সালে বছরখানেক চাকরির পর ব্যবসায় হাত বাড়ান তিনি।

তবে পুরোপরি ব্যবসায় মন দেন ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে। চাকরি ছেড়ে বন্ধুদের পরামর্শে মালয়েশিয়ায় শুরু করেন জনশক্তি আমদানি। ১৯৯৪ সালে জনশক্তি আমদানি বন্ধ করে দেয় মালেশিয়া সরকার। এবার পা বাড়ান অন্য ব্যবসায়। তখন মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি আমদানি করে সাফল্য পান তিনি।

ব্যবসায় কঠোর পরিশ্রম বদলে দিয়েছে ওয়াহিদুরের জীবন। হাটিহাটি পা পা করে শুধু মালয়েশিয়ায় বাঙালি কমিউনিটিতেই নয়, স্থানীয়দের কাছেও অনুকরণীয় তিনি।

জানালেন, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন কোম্পানি তো আছেই, বাংলাদেশি অনেক নামি-দামি কোম্পানির পণ্যেরও মালয়েশিয়ার পরিবেশক ওবায়দুর। সেইদিনের তরুণ ওবায়দুরের বর্তমান বয়স ৪৫ পেরিয়েছে। তার হাত ধরেই অনেকে কর্মসংস্থানে ঢুকেছে হাজারও বাংলাদেশি তরুণ।

আলাপকালে মালয়েশিয়ায় কাটানো জীবনের ২৬ বসন্তের কথাও উল্লেখ করলেন ওয়াহিদুর। বললেন, যখন এখানে পাড়ি জমাই তখন আমার বয়স ১৯। বাবা নেই, সংসারে মা ছাড়া আরও তিন ভাই ও তিন বোন।

১৯৯১ সালের শুরুর দিকে এক বড় ভাইয়ের দোকানের সামনে বসে মালয়েশিয়ায় আসার গল্প করছিলেন বন্ধুরা। সেই বন্ধুরাও মালয়েশিয়াতে নানাভাবে প্রতিষ্ঠিত।

ওয়াহিদুর বলেন, মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে ব্যবসার পরিবেশ ভালো। তবুও দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ রয়েছে প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মো. ওয়াহিদুর রহমান। ছবি: বাংলানিউজ
তার। রাজনৈতিক পরিবেশ সহনশীল হলে বড় ধরনের বিনিয়োগ করবেন।

মালয়েশিয়ায় বাঙালি কমিউনিটির অবস্থান সুদৃঢ় জানিয়ে তিনি বলেন, এদেশে প্রায় আড়াই সহস্রাধিক রেজিস্টার্ডভুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করি আমরা।
দেশে টাকা পাঠানোর বিষয়ে এই প্রবাসী বলেন, আগে ব্যাংক মারফত টাকা পাঠালে ৩০ রিংগিত কেটে রাখা হতো। পিন নম্বরে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়াসহ কিছু উদ্যোগ নেন সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ফলে হুন্ডি মারফত টাকা পাঠানো কমে আসে। এখন বিকাশে পাঠানো হয়, এই জায়গাটিতে কাজ করলে বাংলাদেশ সরকার আরও লাভবান হবে।

‘কেননা প্রবাসীরাও বুঝেন, হুন্ডিতে টাকা পাঠালে ক্ষতির বিষয়টি। অনেক সময় খোয়া যায়। বিকাশে টাকা দিলে সরকার রেমিটেন্স হারায়।’

নিজের এ অবস্থানে আসার পেছনে সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করে তিনি বলেন, ‘শূন্য হাতে এসেছিলাম, যা করতে চেয়েছি তার চেয়ে বেশি পেয়েছি। এখানে ব্যবসার সুযোগ আছে। শুধু সঠিক পথে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন।’

বাংলাদেশে চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া উপযোগী দেশ বলেও মনে করেন এই প্রবাসী ব্যবসায়ী।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের জন্য দেশের ইমেজ ক্ষুণ্ন হয়। তাই যারা ই-লিগ্যাল তাদের উচিত লিগ্যাল হয়ে যাওয়া। নয়তো ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ধরা গেলে সর্বোপরি দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। যদিও সংখ্যার দিক থেকে এটি খুবই কম।

স্ত্রী, এক ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে স্থায়ীভাবেই প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মো. ওয়াহিদুর রহমান। ছবি: বাংলানিউজ
মালয়েশিয়ায় বসবাস করছেন ওয়াহিদুর। তিনি জানান, নিজের হাতে গড়া ব্যবসা বাণিজ্য সবই এখানে। এ দেশের সরকারও স্থায়ীভাবে আবাসন করার অনুমতি দিয়েছি।

সবশেষে জানালেন বাংলাদেশে থাকা মা ও চার ভাই এবং তিন বোনের কথাও। বললেন, ভাইয়েরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। বড়ভাই প্রকৌশলী, ছোটভাই ব্যবসায়ী; আরেক ভাই আছেন শিক্ষকতায়।