Home / Uncategorized / পুলিশ ঘুষ দেয় ১২ খাতে

পুলিশ ঘুষ দেয় ১২ খাতে

থানা পুলিশের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক খাত থেকে ‘বখরা’ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তাদেরও ১২ খাতে টাকা দিতে হয়। চাকরি পাওয়া থেকে শুরু করে নিয়োগ, বদলি, মিশনে যাওয়া, পদোন্নতিসহ চাকরি রক্ষার্থে, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন খাতে তারা টাকা-পয়সা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ কারণে পুলিশের কর্মদক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশকে দক্ষ করতে একদিকে যেমন তাদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, তেমনি তাদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় বর্তমানে পুলিশ যেভাবে বিতর্কিত হচ্ছে তা অব্যাহত থাকবে।

পুলিশের সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক সফিক উল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য যারা বখরা দিচ্ছেন এবং যারা বখরা নিচ্ছেন উভয় পক্ষ সমান দোষী। এটা অতীতে কখনো ছিল না। ঐতিহ্যবাহী এই বাহিনীর সুনাম রক্ষার্থে কর্তৃপক্ষেরও উচিত হবে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।

খিলগাঁও, মুগদা ও মতিঝিল থানা এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেঁধে দেওয়া রুটিন কাজ ছাড়া একশ্রেণির পুলিশ সদস্য তাদের বাকি সময়টা ব্যস্ত থাকছেন বখরা আদায়সহ নতুন নতুন খাত সৃষ্টিতে। পুলিশি হয়রানি থেকে বাদ যাচ্ছে না হিজড়া সম্প্রদায়ও। এসব এলাকার অনেক পুলিশ সদস্যের মাসিক আয় ১৫ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যায়। চাকরিতে যোগদানের আগে মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তী বিভিন্ন প্রশিক্ষণে জনসেবার বিষয়টিতে বিশেষ নজর দেওয়া হলেও ওইসব পুলিশ সদস্যের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে এর প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়। প্রতিকার চেয়ে পুলিশের কাছে যাওয়া ভুক্তভোগীরাও উল্টো শিকার হচ্ছেন নানা হয়রানির। এ চিত্র কেবল শুধুমাত্র তিন থানার নয়, রাজধানীসহ প্রায় সারা দেশের থানার চিত্র অনেকটা একই রকম বলেই দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক পুলিশ সদস্য।

অভিযোগ রয়েছে, খিলগাঁও থানায় বখরা উঠানোর ৫৬টি খাত, মতিঝিল থানায় ৫৩টি। নবগঠিত মুগদা থানার মতো রাজধানীর প্রায় প্রতিটি থানায় কমবেশি ৫০ খাত থেকে বখরা আদায় করা হয়। রাজধানীর বেশির ভাগ থানার অফিসার ইনচার্জ ও ইন্সপেক্টরের তদন্তের মাসিক অবৈধ আয় ১৫ লাখ টাকারও বেশি। রামপুরা-ডেমরা লিংক রোডের উভয় পাশে অন্তত ৪০ জন ইন্সপেক্টরের নামে-বেনামে প্লট কেনা রয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরায় বহুতল ভবনগুলোতে তাদের রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। গুলশান, বাড্ডা, মতিঝিল ও খিলগাঁও থানার বেশ কয়েকজন উপ-পরিদর্শকও অভিজাত ফ্ল্যাটের মালিক। তাদের কেউ কেউ ৭০-৮০ লাখ টাকার গাড়িও হাঁকাচ্ছেন।

তবে একজন ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা পাল্টা ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, পত্র-পত্রিকায় শুধু পুলিশের চাঁদাবাজি-ঘুষ-দুর্নীতি নিয়েই নানা প্রচারণা চলে। কিন্তু দায়িত্বে বহাল থাকতে, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে, ঠুনকো নানা অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পুলিশ কর্মকর্তারাও যে ঘাটে ঘাটে ‘ঘুষ’ দেন, সে কথাটি কেউ লিখে না। ওই কর্মকর্তা গুনে গুনে ১২টি খাতে নিয়মিত ঘুষ প্রদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ঘুষের চাহিদা পূরণের জন্য বখরাবাজি ছাড়া থানার দায়িত্বে থাকার কোনো উপায় নেই। ’

ওই পুলিশ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যে কোনো মামলার চার্জশিট ও ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিসিসহ ঊর্ধ্বতন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ন্যূনতম পাঁচ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। খিলগাঁও থানা সূত্র জানায়, মতিঝিলের ডিসি মাদকের ব্যাপারে কোনো ধরনের টাকা না নিলেও ডিএমপি সদর দফতরের আরেক কর্মকর্তা ঠিকই মাদকের মাসোয়ারা নিয়ে থাকেন। ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, সংঘবদ্ধ চোরচক্রের বিরুদ্ধে ডিএমপি হেডকোয়ার্টারের কড়া হুঁশিয়ারি থাকলেও উপরের চাহিদা মেটাতে সেসব গ্রুপ থেকে ঠিকই বখরা আদায় করা হচ্ছে।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, সোর্স দিয়ে পুলিশের অপরাধ করানোর মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। সোর্সদের কাছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, হাতকড়া এবং পুলিশের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামও দেখা যায়। অনেকেই তাদের পুলিশ মনে করেন। এ ছাড়া অনেক সোর্সের বিরুদ্ধে সরাসরি ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাটের মাধ্যমে সংগৃহীত টাকা-পয়সা পুলিশের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত হবে এসব বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া।

বখরাবাজির যত খাত : এ ছাড়াও রাস্তায় বাজার, ফুটপাথে দোকানপাট, ভাঙ্গাড়ি দোকান, ফলপট্টি, ফরমালিনযুক্ত মাছ বাজার, ভুয়া হাসপাতাল-ক্লিনিক, তথাকথিত মাদক নিরাময় কেন্দ্র, অবৈধ অটো স্ট্যান্ড, রিকশা-ভ্যান, সিএনজি চোরচক্র, অবৈধ রিকশা তৈরির গ্যারেজ, অটোরিকশার ব্যাটারি-বৈদ্যুতিক চার্জ সেন্টার, রাস্তা বা গলিতে নির্মাণ সামগ্রী রাখার স্পট, নোটবই বিক্রির লাইব্রেরি, আবাসিক হোটেল, মরা মুরগি বিক্রেতা চক্র, অবৈধ ও নকল প্রসাধনী সামগ্রী বাজারজাতকারী গ্রুপ, তথাকথিত হারবাল চিকিৎসা কেন্দ্র, টাকা লগ্নিকারী কো-অপারেটিভ সোসাইটি, বেকারি, ময়লা সংগ্রহের ব্যবসা, প্লট-ফ্ল্যাট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান, আদম ব্যবসায়ী, চাকরি প্রদানের নামে গজিয়ে ওঠা প্রতারণা প্রতিষ্ঠান, চোরাই তেল ও মবিল বিক্রেতা, সিটি করপোরেশন, রাজউক ও সরকারের খাস জায়গাজমি দখলকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, এমনকি বেসরকারি ছাত্রী হোস্টেলও পুলিশি বখরার ধকল থেকে রেহাই পায় না।

এগুলোর মধ্যে রাস্তা-গলি দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার থেকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বখরা পাওয়ার নজির আছে। খিলগাঁও এলাকার হিজড়াদের ভাষ্য, কালেকশনের যে টাকা পাওয়া যায় এর মধ্যে ৫০ ভাগ নেন গুরু, ৩০ ভাগ দেওয়া হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। বাকি ২০ ভাগ পায় হিজড়ারা।

পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য : অভিযোগের ব্যাপারে অনেক পুলিশ সদস্য মন্তব্য না করলেও মতিঝিল থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত মনির হোসেন মোল্লা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, অপরাধীরা নিজেদের অপকর্ম নির্বিঘ্ন রাখতে পুলিশের দোহাই দেওয়ার পাঁয়তারা চালিয়ে থাকে। চাঁদাবাজি তো পুলিশের কাজ নয়। শৃঙ্খলাবদ্ধ এ বাহিনীর প্রতিটি কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরদারি থাকে। অনিয়ম, দুর্নীতি আর চাঁদাবাজি চালিয়ে চাকরিতে টিকে থাকার কোনো সুযোগ নেই।

তবে খিলগাঁও থানার ইন্সপেক্টর তদন্ত আনোয়ার হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘পুলিশ ৫৬টা নয়, ৭০টি খাত থেকে চাঁদাবাজি করলেও তা কি প্রমাণ করতে পারবেন? আমরা আইনকে নাচিয়ে চলি, সাক্ষ্য প্রমাণ রেখে পুলিশ কোনো অপকর্ম করে না— এটা ভালো করে শিখে রাখেন। ’ এক প্রশ্নের জবাবে অশ্লীল শব্দ জুড়ে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘সাহস থাকলে লেখেন— ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থানাগুলো থেকে ১২ খাতে ঘুষ নেন। ’ মতিঝিলের উপ-পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া মাত্র পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নিয়মিত চাঁদাবাজি চালিয়ে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বে বহাল থাকার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই।

এক প্রশ্নের জবাবে ডিসি আনোয়ার হোসেন জানান, গত তিন মাসে তার আওতাধীন ছয়টি থানাতেই অন্তত ৩০ জন পুলিশ সদস্য নানা মাত্রায় সাজা পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা, চাঁদাবাজি, ঘুষ দাবিসহ মাদক ব্যবসায় সম্পৃক্ততার নানা অভিযোগ ছিল। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মো. মোখলেছুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, শৃঙ্খলাবদ্ধ একটি বাহিনীতে অবস্থান নিয়ে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ধারাবাহিকভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে থাকার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। পুলিশ সদস্যদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড নজরদারি করতে মাঠ পর্যায়ে বেশ কয়েকটি টিম তত্পর রয়েছে। একজন এডিশনাল ডিআইজির নেতৃত্বে শক্তিশালী টিমও পুলিশের অপরাধ কর্মকাণ্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধে পুলিশের মাঠ পর্যায়ে যারাই জড়িত রয়েছেন প্রত্যেককে কঠোর বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হবে।

  • See more at: http://www.bd-pratidin.com/first-page/2016/02/18/127741#sthash.owbv7vS0.dpuf
Facebook Comments
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.