Categories
এক্সক্লুসিভ

জেনারেল আজিজের ক্ষমতাবলে হারিস জনপ্রতি ৫-৭ লক্ষ টাকা চাঁদা নিত: সাবেক সেনা কর্মকর্তা

জেনারেল আজিজ (General Aziz), বাংলাদেশের সাবেক সেনা প্রধানের নাম এটি।নিজের দায়িত্ব শেষে তিনি নিয়েছেন অবসর। আর সেই থেকেই তার নামে উঠে আসছে নানা ধরনের সব আলোচনা সমালোচনা। বিশেষ করে তার নানা ধরনের সব বিতর্কিত কর্ম কান্ড এখন উঠে আসছে এক এক করে। তাকে নিয়ে এখন চলছে অনেক লেখালেখি। গেল বেশ কিছু দিন ধরেই জেনারেল আজিজ আহমেদকে নিয়ে পর্ব আকারে নিজের অনেক অভিজ্ঞতার কথা বলে যাচ্ছেন। আর সেই ধারাবাহিকতায় আজ তিনি জেনারেল আজিজ(General Aziz) পর্বের ৬ষ্ঠ ভাগ প্রকাশ করেছেন।পাঠকদের উদ্দেশে তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো হুবহু:-

জেনারেল আজিজ (General Aziz) পর্ব-৬

জেনারেল আজিজ ডিজি বিজিবি থাকাকালীন এর রিক্রুটিং পদ্ধতিটা পুরোপুরি নিজের/বিজিবি সদরদপ্তরের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেন। আমি অধিনায়ক ৭ বিজিবি, রংপুর সেক্টর থাকাকালীন প্রথম সৈনিকদের রিক্রুটিং পরিচালনা করি। আমি সেনাবাহিনীতে রিক্রুটিং পদ্ধতির সাথে পরিচিত ছিলাম। সেখানে গোয়েন্দা সংস্হায় চাকুরীকালে বেশ কিছু অনিয়মের বিস্তারিত তদন্তের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। তাই বিজিবির নিয়মকানুন আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি।

আমি রিক্রুটিং এর আগের দিন জানলাম প্রায় পাঁচ শত প্রার্থী আসবে। আমাদের কেন্দ্রের কোটা ২২ জন আর আমাকে সম্ভাবত ২৪ জনের ইন্ডেক্স নং দিয়ে বলা হল এই ২৪ জনের ফলাফল তারা মেডিকেলে আনফিট বা লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার যে কান পর্যায়ে ফেল করলেও তাদের ফলাফল বিজিবি সদরদপ্তরে পাঠাতে হবে! তার মানে সকল প্রার্থীর মধ্যে যারা মেডিকেল বা অন্যান্য বিষয়ে ফেল করবে তাদের আমি ফাইনাল রেজাল্ট দিয়ে দেব এবং বলব তুমি ফেল করেছ বাড়ী চলে যাও কিন্তু সেই ২৪ জন ফেল করলেও তাদের ফেইল রেজাল্ট সহ সদরদপ্তরে পাঠাতে হবে। এই নির্দেশিকা পাওয়ার পর যে কারো মনে প্রশ্ন জাগবে এই ২৪ জন কারা? কেন তারা ফেইল করলেও তাদের ফলাফল পাঠাতে হবে? আমি তখন আমার সেক্টর কমান্ডারের সাথে কথা বললাম, তিনি আমাকে বিরক্তি সহকারে বললেন “এত প্রশ্ন করার কিছুনাই! তোমাকেতো কেউ ফেল করলে তাকে পাস করিয়ে দিতে বলছেনা? তুমি ফলাফল সদরদপ্তরে পাঠালে তারা ডিসিশন নিবে।” কথা সত্য তবে আমি তারপরও পরিচিত কয়েকজন অধিনায়ক আর বিজিবি সদরদপ্তরে সংশ্লিষ্ট অফিসারের সাথে কথা বলে বুঝলাম এখানে আমার উচ্চবাচ্য করার কিছু নেই! কেউতো আমাকে ফেইল কে পাস করাতে বলছেনা। তবে অধিনায়কদের একজন এবং সেক্টরের এক অফিসারের সাথে কথা বলে অনিয়মের গন্ধ পেলাম।

যাহোক পরদিন আমি রিক্রুটিং পরিচালনার আগে মেডিকেল অফিসার এবং আমার উপঅধিনায়ককে সর্ব্বোচ্য সততার সাথে পরীক্ষা পরিচালনা করার জন্য অনুপ্রানীত করে নিজে কঠোরভাবে প্রতিটি পর্ব পর্যবেক্ষণ করলাম। সেই ২৪ জনের মধ্যে ৩ জন মেডিকেলে আনফিট আর দুই জন লিখিত পরীক্ষায় ফেইল এবং ১ জন উভয় পরীক্ষায় ফেইল। আমরা সবার ফলাফল বিজিবি সদরদপ্তরে পাঠিয়ে আমার দায়ীত্ব শেষ করলাম। দায়ীত্ব শেষ করলাম কিন্তু অতৃপ্তি রয়ে গেল, স্পস্ট বুঝতে পারছি বিজিবি সদরদপ্তরে কোন অনিয়ম হচ্ছে! বিজিবির গোয়েন্দা সংস্হার কয়েকজন অফিসারের সাথে কথা বলে বুঝলাম বা তারা আমাকে বোঝাল এটাই স্বাভাবিক পদ্ধতি।

আমি সবার বোঝার সুবিধার্থে আমার জেনারেল আজিজ পর্ব-১ এর একটি প্যারা কপি পেস্ট করছি:

“এ বিষয়টি পরিষ্কার করে বুঝার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করি। জেনারেল ইকবাল করিম সেনাপ্রধাণ থাকাকালীন সময়ে একটি অসাধু চক্র ধরা পড়ে, যারা সেনাবাহিনী এবং বিজিবিতে অর্থের বিনিময়ে রিক্রুটিংয়ের সাথে জড়িত। তখন আমি গোয়েন্দা সংস্হায় চাকুরীর সুবাদে বিস্তারিত জানলাম । এই চক্রের একজন ছিল বিজিবিতে কর্মরত লে: কর্ণেল শাহজাহান সিরাজ। আমি সিরাজ স্যারকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি, তাই এ বিষয়ে তার সংশ্লিষ্টতা আছে জেনে বেদনাহত হই। তখন সিরাজ স্যারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিজিবি থেকে সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তন করার জন্য আদেশজারী করলেও তৎকালীন ডিজি বিজিবি জেনারেল আজিজ এক প্রায় এক বছর তাকে সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠাননি। শুধু তাই নয়, তিনি সেনাপ্রধান (Chief of Army Staff) হয়ে তাকে শাস্তি দূরে থাক তাকে কর্ণেল পদে পদোন্নতি দেন।”

আলজাজিরার “অল দ্যা প্রাইম মিনিস্টারস্ ম্যান”(All the Prime Minister’s Man) এ হারিসের সামির(Sami) সাথে কথোপকথন আর আমার তৎকালীন নিজস্ব তদন্তে আমি নিশ্চিত হই লে: কর্নেল শাহজাহান সিরাজ(Lt. Col. Shahjahan Siraj) ছিল হারিসের বিজিবি কন্টাক্ট। একারনেই লে: কর্নেল সিরাজ সেনাবাহিনীর তদন্তে দোষী সাবস্ত্য হলেও জেনারেল আজিজ তাকে সেনাবিহিনীতে তার প্রত্যাবর্তন আদেশ দেয়া হলেও তাকে ফেরত পাঠায়নি। পরবর্তিতে তাকে কর্নেল পদে পদন্নতি দেন।

জেনারেল আজিজ(General Aziz) এর ভাই হরিস বিজিবিতে লোক ভর্তির জন্য ৫-৭ লক্ষ টাকা নিত যা তৎকালীন সেনাবাহিনীর তদন্তেও উঠে আসে। তবে এই লোক ভর্তির সবাই টাকার বিনিময়ে নয়, একটি অংশ ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যাক্তিবর্গের সুপারিসে ভর্তি। তবে তদন্তে আরেকটি বিষয়ও উঠে আসে যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিদের সুপারিশে আসে তাদের ৬০% এর মত তারপরও বিভিন্ন অংকের ঘুষ দিয়ে থাকে।

জেনারেল আজিজ ডিজি বিজিবি(BGB ) থাকাকালীন সীমান্ত ব্যাংক উদ্ভোধন করেছেন। নতুন ব্যাংকের জনবল নিয়োগের সময় নজীরবিহীন দুর্নীতি করেছেন। আমি তখন আমার ব্যাটালিয়ানের দুই জেসিওর সন্তানদের এই ব্যাংকে চাকুরীর সুপারিশ করতে গিয়ে এর ভয়াবহতা জানতে পারি। এই ব্যংকের শেয়ার বিজিবির সকল পদবীর কাছে এটা ১/২ বছরে দ্বীগুন হবে মর্মে প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন অংকের শেয়ার ক্রয় করতে বাধ্য করে। কিছুদিন আগে আমেরিকায় পারি জমানো এক অফিসারের কাছে শুনলাম চার বছর পর ৪ লক্ষ টাকার শেয়ার বিক্রি করে সে পেয়েছে ৪লক্ষ ৪ হাজার টাকা।

জেনারেল আজিজ বিজিবি আর সেনাবাহিনীর রিক্রটিং(Army recruiting) সিস্টেমকে ধ্বংস করেছে। তিনি সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে যেন কোন বিরোধীদল মনোভাবপন্ন কোন পরিবারের সদস্য ঢুকতে না পারে সেই ব্যাবস্হা নিশ্চিত করেছেন। বিজিবি আর সেনাবাহিনীতে দুর্নীতিকে একটি স্বাভাবিক বিষয়ে রুপদান করেছেন। নির্বাচনের ডিউটিতে থাকাকালীন সেনা সদস্যদের অতিরিক্ত টাকা/ঘুষ প্রতি অফিসারকে গাড়ী কেনার জন্য ৩০লক্ষ টাকা করে দেয়া মূলত তার পরিকল্পনা। তার পরিকল্পনাতেই অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের সংগঠন রাওয়া তার স্বাধীনতা হারিয়েছে। একদল অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের বিভিন্ন ব্যাবসায়িক সুবিধা দিয়ে তিনি পোষেন আওয়ামীলীগ বিরোধী মতামতের বিরুদ্ধে অবস্হান নেবার জন্য।

তবে আমি এই জেনারেল আজিজ পর্ব লেখার প্রথম কয়েকটি পর্বে সরকার নিয়ন্ত্রিত বট কমেন্টের মুখামুখি হলেও গত দুই পর্বে তাদের দেখছিনা। এর ব্যাখ্যা একটাই হতে পারে; জেনারেল আজিজ ছিল আওয়ামীলীগের(Awami League) টিস্যু পেপার। ব্যাবহার শেষে তার অবস্হান এখন ডাস্টবিনে। তবে তারা দ্বারা সেনাবাহিনীর যে ক্ষতি হয়েছে তা কখোনো পূরন হব?

প্রসঙ্গত, আল জাজিরার প্রতিবেদনটি প্রকাশ হবার পর থেকেই মুলত জেনারেল আজিজের নামে সারা দেশে সৃষ্টি হয় ব্যাপক সমালোচনা। আর সেই থেকেই তাকে নিয়ে দেশ বিদেশে শুরু হয়েছে নানা ধরনের লেখালেখি।এরপর আন্তর্জাতিক আরেকটি গণমাধ্যমে তিনি সাক্ষাতকার দিলে সেখানেও তার বেশ কিছু বক্তব্যে হয় বেশ বিতর্কিত। বর্তমানে তিনি রয়েছেন দেশের বাইরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.