পশ্চিমবঙ্গে জেলখানায় বন্দীদের সশস্ত্র তাণ্ডব

পশ্চিমবঙ্গে জেলখানায় বন্দীদের সশস্ত্র তাণ্ডব

বিভিন্ন বয়সের কয়েকশো মানুষ প্রায় উন্মত্তের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন গোটা মাঠ জুড়ে। কারও হাতে বাঁশের লাঠি, উইকেট, লোহা বা স্টিলের রড। কারও হাতে আবার ধারালো বঁটি! একটু দূরে বিশাল বাড়িটা থেকে সার্চ লাইট এসে পড়ছে মাঠে। টানা বেজে চলেছে পাগলা ঘণ্টি! সোমবার সন্ধ্যায় বারুইপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের দৃশ্যটা ছিল এমনই।

ঘণ্টা চারেক ধরে গোটা সংশোধানাগার চত্বর কার্যত বন্দিদের দখলে চলে যায়। সশস্ত্র বন্দিদের ওই রকম মারমুখী দেখে প্রথম দিকে রীতিমতো পালিয়ে থাকেন কারা কর্মকর্তা এবং রক্ষীরা। পরে কারারক্ষী এবং বারুইপুর পুলিশের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বন্দিদের দফায় দফায় সংঘর্য চলে। বন্দিরা ইট ছুড়তে থাকে। পাল্টা ব্যাপক লাঠি চার্জ করে পুলিশ এবং কারারক্ষীরা। কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, কাঁদানে গ্যাসও ব্যবহার করা হয়। যদিও পুলিশ বা কারা দপ্তর সেই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

প্রায় চার ঘণ্টার চেষ্টায় বিদ্রোহী বন্দিদের নিজের নিজের ওয়ার্ডে ঢুকিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও মঙ্গলবারও বিক্ষোভ চলছে বারুইপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে। সোমবার রাতে বন্দিদের বিক্ষোভের ছবি রীতিমতো ভিডিও আকারে সংশোধানাগারের চার দেওয়ালের বাইরে চলে এসেছে। যেখানে কারা দপ্তরের ছোট-বড়-মেজ সব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে দেখা গিয়েছে বন্দিদের।

যদিও সেই ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার। সেখানে বন্দিরা দাবি করেছেন, নিজেদের অভাব অভিযোগ তাঁরা জানাতে চান খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে। একান্তই যদি তা সম্ভব না হয়, সে ক্ষেত্রে নিজেদের অভিযোগের কথা তাঁরা কারামন্ত্রীকে জানানোর দাবি করেন। কারা দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হলে খোদ কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস নিজে সোমবার রাতে যান বারুইপুর সংশোধনাগারে।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘রাত প্রায় দেড়টা অবধি আমি বারুইপুরে ছিলাম। শুনেছি এ রকম কিছু ভিডিওর কথা। আমি গোটা বিষয় নিয়ে রিপোর্ট দিতে বলেছি। রিপোর্ট পাওয়ার পর দেখব, দপ্তরের কর্মীদের কী ভূমিকা।’

মন্ত্রী জানান, ওই মারমুখী বন্দিরা বারুইপুর সংশোধনাগারে যে আধুনিক রান্নাঘর এবং খাওয়ার জায়গা তৈরি করা হয়েছিল তা ভাঙচুর করে তছনছ করেছে। সেই সঙ্গে বিচারাধীন বন্দিদের জন্য সরাসরি আদালতে হাজির না হয়েও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যে শুনানির ব্যবস্থা ছিল তা-ও ভাঙা হয়েছে। উজ্জ্বলের প্রশ্ন, ‘ওই ব্যবস্থাগুলি করা হয়েছিল বন্দিদের ভাল ভাবে রাখার জন্য। যাঁরা সেগুলো নষ্ট করেছেন তাঁরা তা হলে ভাল ব্যবস্থা চাননা।’

সোমবার বিকেলে নিয়ম মাফিক বন্দিদের মাথা গুনতির সময় থেকেই শুরু হয় বিক্ষোভ। প্রাথমিক ভাবে কারা কর্মীদের একাংশ দাবি করেছিলেন, সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরে যখন গোটা সংশোধনাগার চত্বর বন্দিদের দখলে চলে যায়, তখন কারা দপ্তরের কর্মীদের একটি অংশ দাবি করেছিলেন, বন্দিদের ওয়ার্ডে থাকা বেআইনি মোবাইল তল্লাশি এবং বাজেয়াপ্ত করাকে কেন্দ্র করেই গন্ডগোলের সূত্রপাত।

কিন্তু সংশোধনাগারের ভিতরের যে ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে, সেখানে বন্দিদের বয়ানে উঠে এসেছে অন্য বক্তব্য। তাঁরা সেখানে দাবি করছেন, ‘এখানে ইউটি (বিচারাধীন) এবং কনভিক্ট (সাজাপ্রাপ্ত)-দের মধ্যে কোনও লড়াই নেই। জেলের অফিসাররা মিথ্যা কথা বলছেন।’ ভিডিওতে, বন্দিদের বয়ানে উঠে এসেছে জেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ।

এক বন্দিকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘জেলের মধ্যে যে ফোন পাওয়া যাচ্ছে তা কোথা থেকে আসছে? আমাদের জেলের বাইরে বেরোনোর সময় বা জেলে ঢোকানোর সময় সার্চিং হচ্ছে। জেলের বড়বাবু সুখেন্দুবাবু আমাদের ফোন দিচ্ছেন। জেলর স্বপন দাস আমার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন। কেন? আমাকে বলেছেন, জেলের মধ্যে তুই ফোন চালা। কেস চালা। কোনও সমস্যা নেই। স্বপনবাবুও জেলে ফোন দিয়ে যাচ্ছেন আমাদেরকে। বলছেন, বড় ফোন জেলে ঢোকালে (স্মার্ট ফোন) ৪ হাজার টাকা দিতে হবে। ছোট ফোন হলে ২ হাজার টাকা। তা হলে জেল কি ব্যবসা করার জায়গা?’

অন্য এক বন্দির ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে তাঁর অভিযোগ, ‘আমাকে কোনও কারণ ছাড়াই সেলে বন্দি করে দেওয়া হয়েছে। আমি জেল কর্মকর্তাদের ঘুষ চাওয়ার প্রতিবাদ করে ডিজি অরুণ গুপ্তকে দু’টি চিঠি দিয়েছি। অথচ কেউ আমার সঙ্গে কথা বলতে আসেননি। বাধ্য হয়ে আমি পাঁচদিন ধরে অনশন করছি। তা-ও জেল কর্তৃপক্ষ ভ্রূক্ষেপ করছেন না।’

এ রকমই একের পর এক বন্দি জেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন। জেল কর্মকর্তাদের একাংশ সূত্রে খবর, প্যারোলে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের ছাড়া নিয়ে বড়়সড় চক্র চলছে সংশোধনাগারের ভিতরে। নিয়ম অনুসারে সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের প্যারোলে ছাড়ার ক্ষমতা রয়েছে কারা দপ্তরের অধির্কতা বা ডিরেক্টর জেনারেলের। সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের আত্মীয়দের অভিযোগ, জেলের কর্মকর্তাদের মোটা নজরানা না দিলে প্যারোল পাওয়া যাচ্ছে না। এক জেল কর্মকর্তা বলেন, ‘প্যারোলে ছাড়া পাওয়া বন্দির আইনি অধিকার। প্রতি ৬ মাস অন্তর যে কোনও সাজা প্রাপ্ত বন্দি একটানা ১৫ দিন পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে পারেন। তবে তা ডিজিকে অনুমোদন করতে হয়।’

পার্ক স্ট্রিটের সাব্বির আলম বা উল্লু রাজুর পরিবারের অভিযোগ, বাবা মারা যাওয়ার সময় উল্লু জেল কর্তৃপক্ষের কাছে শর্ট প্যারোল বা কয়েক ঘণ্টার জন্য বাড়ি যেতে চেয়েছিল। বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে। অভিযোগ, জেল কর্মকর্তাদের দাবি না মেটানোয়, বাবার শেষকৃত্য হয়ে যাওয়ার পর রাত ১১টায় তাকে ছাড়া হয়।

এই সংশোধনাগারেই বন্দি পার্ক স্ট্রিট গণধর্ষণে সাজাপ্রাপ্ত সুমিত বাজাজ এবং নাসের খান। অন্য বন্দিদের আত্মীয়দের অভিযোগ, নাসির-সুমিতরা বছরে নির্দিষ্ট দুবারের বদলে তিনবার প্যারোলে ছাড়া পাচ্ছে। ডিজির সুপারিশে তাদের সাজার মেয়াদও কমছে। অভিযোগ, সবটাই হচ্ছে নাসিররা জেলে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে বলে। সাধারণ বন্দি বা যাঁদের সেই টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই তাঁরা সমস্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কোনও অন্যায় বরদাস্ত করা হবে না। ভাঙচুর যারা করেছে তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনও কারা কর্মী দুর্নীতিগ্রস্ত কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা হবে।’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2017 RTNBD.net