আওয়ামিলিগ নেতার আশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌছে যান ব্যাংক লুটেরা প্রশান্ত কুমার হালদার

148

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার) যিনি কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। সাম্প্রতিক সময়ে এই অর্থ আত্মসাৎ করে তিনি সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন। দূদক তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলাও দায়ের করেছেন। তিনি পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্স নামের দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে ছিলেন এবং সেখান থেকে ৩,৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। তার উপর বিদেশ যাবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল দুদক কিণ্তু তার পরও তিনি কীভাবে বিদেশ যেতে সক্ষম হলো তা নিয়েও চলছে তদন্ত। তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধাকালীন সময়ে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। জানা যায়, প্রশাস্ত কুমার হালদার যে সকল কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত আছে তাদের তিনি মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বিদেশে যাবার পরিকল্পনা সার্থক করেন।

তিনি এত দিন কানাডার মন্ট্রিলে আওয়ামী লীগের নেতা মোস্তাক এ সরকারের প্রশ্রয়ে ছিলেন। ওই নেতাসহ আরও কয়েক বাংলাদেশির সঙ্গে যৌথভাবে আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান রুনা করপোরেশনে বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হন প্রশান্ত। তবে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শুরুর সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর গত ১৯ জানুয়ারি ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তালিকা থেকে প্রশান্তর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কানাডা প্রবাসী কয়েকজন বাংলাদেশির মাধ্যমে এ-সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।

৮ জানুয়ারি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি প্রশান্তর বিরুদ্ধে ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে কমিশন প্রশান্তর যেসব স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ উল্লেখ করেছে, সেগুলো জব্দ করার জন্য আদালতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আদালত তা মঞ্জুর করেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কমিশনের উপপরিচালক মো. সালাউদ্দিন বৃহস্পতিবার বলেন, ’প্রশান্তর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের জন্য আমরা পাঁচ দিন আগে আদালতে আবেদন করেছি। আদালত তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা) আমরা আদেশের কপি হাতে পাইনি। যেহেতু তার সম্পদের পরিমাণ বিশাল, তাই সেগুলো জব্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ বিষয়।’

এদিকে প্রশান্তর বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অর্থ পাচারসংক্রান্ত খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা অনুসন্ধানের জন্য আমলে নিয়েছে দুদক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক পরিচালক গনমাধ্যমকে বলেন, ’প্রশান্তর বিরুদ্ধে কানাডা, ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচার করার কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি। তা ছাড়া কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা, তার ব্যবসায়িক সহযোগীদের নাম-পরিচয় পেয়েছি। এসব তথ্য যাচাই করার জন্য আমরা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে পাঠাব। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল দপ্তরের মাধ্যমে তথ্য চেয়ে কানাডা সরকারের কাছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকুয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হবে।’

কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কানাডার মন্ট্রিঅলে আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ততা রয়েছে প্রশান্তর। মন্ট্রিঅলে তার ব্যবসায়িক অংশীদার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও পেশায় অ্যাকাউনট্যান্ট মোস্তাক এ সরকার। এ ছাড়া মোস্তাক কানাডা-বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা। কুমিল্লার বাসিন্দা মোস্তাক একবার স্বতন্ত্র ও তিনবার কনজারভেটিভ পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে মন্ট্রিঅলে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হয়েছিলেন। তার প্রতিপক্ষ ছিলেন দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। কিন্তু প্রতিবারই মোস্তাক শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। মোস্তাক ২০১২ সালের ২৩ জুলাই ৩-৫২৪ রুই জ্যাঁ ট্যালন ও, মন্ট্রিঅল, কুইবেক এইচ৩এন১আর৫ ঠিকানায় রুনা করপোরেশন নামে একটি আবাসন খাতের কোম্পানি খোলেন। সেটি এখন নিবন্ধিত দেস এন্টাপ্রাইজেস কুইবেকের নিবন্ধনভুক্ত। এর পরিচিতি নম্বর : ১১৬৮৪২০১৬৫। প্রতিষ্ঠানটিতে আতিকুল আলম চৌধুরী, আবদুস সামাদ, সাহানা ফেরদৌস, তৌফিকুল আলম চৌধুরী ও জাওয়াদুল আলম চৌধুরী পরস্পরের সহযোগী। রুনা করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মোস্তাক ২০১৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্ব পালনকালে প্রশান্ত কোম্পানিটিতে যোগ দেন।

রুনা করপোরেশনের নিবন্ধন তথ্যে জানা গেছে, বাংলাদেশের ১০, ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টার, জিপিও, পুরানা পল্টন, ঢাকার ঠিকানা ব্যবহার করে প্রশান্ত ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত রুনা করপোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তবে এখনো তিনি কোম্পানিটির অংশীদার। টরন্টোর পি অ্যান্ড এল হাল হোল্ডিং ইনক ও মন্ট্রিঅলে রুনা করপোরেশনে প্রশান্ত বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। রুনা করপোরেশন কানাডায় বড় বড় আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের জন্য পরিচিত। তাদের নির্মিত বিপুলসংখ্যক স্থাপনা রয়েছে কানাডার বিভিন্ন শহরে।

কানাডার সবচেয়ে বড় শহর টরন্টোতে প্রশান্ত জনৈক প্রীতিশ কুমার হালদার ও সুস্মিতা সাহাকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৪ সালের ৩ জুলাই পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনকরপোরেটেড নামে একটি কোম্পানি খুলেছেন (যার ফাইল নম্বর : ৮৯৪২৯১৯; ঠিকানা : ১৬ ডিনক্রেস্ট রোড, টরন্টো, অন্টারিও এম৯বি ৫ডব্লিউ৪)। পরে প্রীতিশ কানাডার ওই ঠিকানাটি ব্যবহার করে প্রিয়সী সাহার সঙ্গে ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর হালট্রিপ টেকনোলজি প্রাইভেট লিমিটেড (করপোরেশন আইডেন্টিফিকেশন নম্বর : ইউ৭২৫০১ডব্লিউবি২০১৮পিটিসি২২৮১৯২ ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর : ২২৮১২) ৪ এফআর, এফএল-৪ই, ১৮ মহাজাতি রোড, এলপি-১০০/২৬, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ-৭০০০৭৯, ভারত ঠিকানায় কোম্পানি খোলেন। যদিও সেখানে প্রিয়সীর ঠিকানাটি হচ্ছে : কে এন রায় লেন, কৃষ্ণনগর-১, নদিয়া, পশ্চিমবঙ্গ-৭৪১১০১ ভারত।

প্রশান্তর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ট্রিঅলের আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাক গতকাল দুপুরে মোবাইল ফোনে গনমাধ্যমকে বলেন, ’প্রশান্ত রুনা করপোরেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এখন নেই।’ কথা বলার সময়টিকে ’রাত আড়াইটা’ উল্লেখ করে ’পরে ফোন দেবেন’ বলেন মোস্তাক। এরপর আবার ফোন করলে এবং বার্তা পাঠালে কোনো জবাব দেননি তিনি।

পিকে হালদারের পৈতৃক নিবাস পিরোজপুরের নাজিরপুর দিঘিরজান গ্রামে এবং তার পিতার নাম প্রণাবিন্দ হালদার। তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভের পর এনআরবি (নন-রেসিডেন্স বাংলাদেশি) গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হিসেবে যোগদান করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে তিনি বেশ কিছু ব্যাংক ও লিজিং কোম্পানির শীর্ষস্থানীয় পদে কর্মরত ছিলেন এবং সে সময় থেকে তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করটেন এবং বিপুল সম্পদের কুক্ষিগত করেন। তিনি নিজ নামে এবং বেনামে ব্যাংক হিসাব খুলে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা রাখেন। শুধু তার নিজ নামেই রয়েছে ২৪০ কোটি ৮৭ লাখ টাকার ব্যাংক হিসাব, এছাড়া তার মা লীলাবতী হালদারের নামে রয়েছে ১৬০ কোটি টাকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে ১,২৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে তিনি অনেকটা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৩,৫০০ কোটি টাকা তার নিজ এবং প্রতিষ্ঠানের নামে নিয়ে চম্পট দেন যা দুদক আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে, বলেও জানা যায়।