নিরাপত্তা কর্মকর্তার হাতেই অনিরাপদ জাবি ক্যাম্পাস

83

নিরাপত্তা কর্মকর্তার হাতেই অনিরাপদ জাবি ক্যাম্পাস
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও জাবি প্রতিনিধি
২৭ অক্টোবর, ২০২০ ০২:৫২

নিরাপত্তা কর্মকর্তার হাতেই অনিরাপদ জাবি ক্যাম্পাস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁর কাঁধে খোদ তাঁর হাতেই অনিরাপদ হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহিন। তাঁর নানা অপকর্ম নিয়ে এরই মধ্যে ৩০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাঁর অপকর্মের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।

ক্যাম্পাসে মাদকের কারবার ও ছিনতাইয়ে সহযোগিতা, মাদক সেবন, দর্শনার্থীদের মারধর, যৌন হয়রানি, ভ্যান ও রিকশাচালকদের মারধর, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করা, মাদক দিয়ে নিরীহ লোকজনকে ফাঁসিয়ে দেওয়া, নারী সংবাদকর্মীকে উত্ত্যক্ত করা, শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি—এমন নানা অভিযোগ রয়েছে সুদীপ্ত শাহিনের বিরুদ্ধে। এর পরও এসব ঘটনার কোনোটিতেই তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আগের একটি ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তা সিন্ডিকেটে তোলা হয়নি।

সর্বশেষ গত ১৬ অক্টোবর ক্যাম্পাসে পিটিয়ে নাহিদ নামের এক ভ্যানচালকের পা ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। পেশায় চায়ের দোকানি হলেও দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় জীবিকার তাগিদে ভ্যানে পণ্য পরিবহন করে থাকেন নাহিদ। ওই দিন বন্ধ ক্যাম্পাসে পণ্য পরিবহনের জন্য ভ্যান নিয়ে প্রবেশ করেন তিনি। সন্ধ্যায় পণ্য পরিবহন শেষে বাসায় ফেরার পথে এক নারীর অনুরোধে তাঁকে ভ্যানে করে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগের সময় নাহিদকে আটক করেন সুদীপ্ত শাহিন। পরে নিরাপত্তা শাখার অফিসকক্ষে নিয়ে পিটিয়ে তাঁর পা ভেঙে দেওয়া হয়।

মারধরের শিকার নাহিদ গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ভ্যান নিয়ে আসার সময় সুদীপ্ত শাহিন আমাকে আটক করে। আমাকে কন্ট্রোল রুমে (নিরাপত্তা কর্মকর্তার অফিসকক্ষ) ধরে নিয়ে গিয়ে লাঠি দিয়ে খুব মারধর করে এবং গায়ে-মুখে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। আমাকে প্রায় চার ঘণ্টা ওই রুমে আটকে রাখা হয়। মারধরের ঘটনা কাউকে জানালে মাদক কারবারি হিসেবে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে পরে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।’

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আট শতাধিক শিক্ষার্থী গুগল ফরমের মাধ্যমে অনলাইনে গণস্বাক্ষর করে সুদীপ্ত শাহিনের অপসারণসহ চার দফা দাবি জানান। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আগের অভিযোগ তদন্তে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ওই কমিটির সদস্যসচিব মাহতাব উজ জাহিদ বলেন, ‘খসড়া প্রতিবেদন প্রস্তুত হয়েছে। কাল-পরশু একটি খসড়া স্যারদের দেব। তাঁরা দেখার পর আমরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেব। এখানে তিনটি অভিযোগ (দর্শনার্থীকে মারধর, নারী সংবাদকর্মীকে উত্ত্যক্ত করা ও সাবেক শিক্ষার্থীকে লাঞ্ছিত করা) নিয়ে কাজ করেছি। এরপর এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট করণীয় নির্ধারণ করবে। আমরা মূলত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং (অভিযোগের সত্য-মিথ্যা) তদন্ত কমিটি।’

সুদীপ্ত শাহিনের যত অপকর্ম : সুদীপ্ত শাহিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। গত এপ্রিলে মাহবুব আলম নামের রসায়ন বিভাগের এক শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় গত ২ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ওই শিক্ষক। এর আগে গত বছরের ২ ডিসেম্বর এক সহকারী অধ্যাপকসহ সাবেক দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ২৫তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী আকবর আলী বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। এ ছাড়া গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদ উপস্থাপিকাকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ ওঠে সুদীপ্তর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ওই সংবাদ পাঠিকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তির অভিযোগও দীর্ঘদিনের। গত বছরের ১৯ জানুয়ারি মাদকাসক্ত অবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. শরীফকে মারধর করেন। এর বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী সমিতি মানববন্ধন, উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ এবং রেজিস্ট্রারকে স্মারকলিপি দেন কর্মচারীরা। এ ঘটনাগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সময় দর্শনার্থীদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

সূত্রের খবর অনুযায়ী সুদীপ্ত শাহিনের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩০টির বেশি অভিযোগ প্রশাসনের কাছে জমা পড়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি অভিযোগের তদন্তে কমিটি গঠন করা হলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত কমিটি থেকে প্রতিবেদন দাখিল করা হলেও ‘তদন্তে ঘাটতি’র অজুহাতে তা সিন্ডিকেটে তোলা হয়নি। কোনো এক অদৃশ্য কারণে এত অভিযোগের পরও বিচার হয়নি। নেওয়া হয়নি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে একাধিকবার চেষ্টা করেও সুদীপ্ত শাহিনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে এর আগে তিনি গণমাধ্যমের কাছে ভ্যানচালক নাহিদ বা বহিরাগতদের মারধরের ঘটনা অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, সিকিউরিটি ইনচার্জের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ক্যাম্পাসে একাধিক মাদকের স্পট উচ্ছেদ করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মেনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রহিমা কানিজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্যানচালককে মারধরের একটি অভিযোগ নিয়ে আমরা সভা করেছি। তদন্ত কমিটি দ্রুতই প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদন পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’ আগের অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও তারা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করেনি। তাই সেটি পরে আর সিন্ডিকেটে তোলা হয়নি।’

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলম বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করেছি। তিনটি অভিযোগের তদন্ত করেছি। এখন আমাদের কমিটির সদস্যসচিব তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করছেন। এই সপ্তাহে বা আগামী সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।