সুশাসনের ঘাটতিতে বাড়ছে রিট মামলা

IPL ের সকল খেলা  লাইভ দেখু'ন এই লিংকে  rtnbd.net/live

রাজধানীর খিলগাঁও থানায় ২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল দায়ের হওয়া একটি মামলায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থানার শাহজাদপুর গ্রামের আহসান উল্লাহর ছেলে মোদাচ্ছের আনছারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়ার পর মোদাচ্ছের নিজের পরিচয় দেন নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভার মোহাম্মদ আব্দুল কাদেরের ছেলে মোহাম্মদ জহির উদ্দিন হিসেবে। ওই বছরের ৩১ অক্টোবর মোদাচ্ছের জামিনে বেরিয়ে পালিয়ে যান। পুলিশ ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল জহির উদ্দিনসহ অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। এরপর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর জহিরের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এ অবস্থায় জহির উদ্দিন হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কার্যকারিতা স্থগিত করে রুল জারি করেন। পরে রুল নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট বদলি সাজা খাটা ঠেকাতে এবং প্রকৃত আসামি চেনার সুবিধার্থে কারাগারগুলোতে পর্যায়ক্রমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করতে নির্দেশনা দেন। পিতার স্বীকৃতি না পাওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ের এক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন ফরমে বাবার নাম লিখতে পারেনি। ফলে তাকে রেজিস্ট্রেশন কার্ড দেয়নি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে ২০০৯ সালে রিট আবেদন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নারীপক্ষ ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। গত জানুয়ারিতে রুলটি নিষ্পত্তি করে দেওয়া রায়ে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন এবং পরীক্ষার ফরম পূরণে বাবা ও মায়ের নাম উল্লেখ বাধ্যতামূলক নয়। সেই সঙ্গে ফরমে মা-বাবার পাশাপাশি আইনগত অভিভাবক যুক্ত করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে বাবা অথবা মা অথবা আইনগত অভিভাবকের মধ্যে যেকোনো একজনের নাম দিলেই চলবে।এবার পয়লা বৈশাখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন মিরপুরের মনিপুর স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। তবে শুনানির আগেই ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে কর্তৃপক্ষ।এ রকম কয়েক হাজার রিট মামলা হচ্ছে প্রতিবছর। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উচ্চ আদালতে রিট করেন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা ফিরে পেতে রিট মামলা করা হয়। অনেকে করেন জনস্বার্থে। কেউ কেউ রিট করেন আইনের পরিপন্থী কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। এতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রিট মামলার সংখ্যা। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৫টি রিট মামলা বিচারাধীন ছিল।এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, কারও অধিকার খর্ব হয়েছে কি না তা নির্ণয় করবেন হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ। রিট দায়ের থেকে বোঝা যায়, দেশে জনগণের বিচার চাওয়ার স্বাধীনতাটা আছে; যা অনেক দেশেই নেই। আর কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় না দেওয়া পর্যন্ত সেটা বেআইনি বলা যায় না। কোনো বিষয়ে কারও প্রশ্ন থাকলে তিনি রিট করতে পারেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা মনে করেন, বেআইনি কাজ ও প্রশাসনিক অনিয়ম বেশি হচ্ছে বলেই রিট মামলার হার বাড়ছে।মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘একটা আইনের কাজ ঠিকমতো না হলেই রিট হয়। যদি প্রশাসন আইন অনুযায়ী কাজ করত তাহলে রিট করার প্রয়োজন হতো না। রিট মামলা বাড়ায় বুঝতে হবে, বেআইনি কাজ তত বেশি হচ্ছে। তবে এখন মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। আগে মানুষ চুপ থাকত, এড়িয়ে যেত। এখন থাকে না, চ্যালেঞ্জ করে। মানুষ জানে কোর্টে গেলে কিছু একটা হতে পারে। তাই প্রতিকারের জন্য মানুষ উচ্চ আদালতে আসে।’সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, যেহেতু সুশাসনের ঘাটতি আছে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতিসহ নানা অনিয়ম ঢুকে পড়েছে; তাই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় প্রতিকার না পেয়ে মানুষ বাধ্য হচ্ছে আদালতের দ্বারস্থ হতে।এক যুগে রিট মামলা ও নিষ্পত্তি সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন ছিল ৪০ হাজার ৯১৬টি রিট মামলা। ২০১১ সালে দায়ের হয় ১১ হাজার ৫৮৭টি, নিষ্পত্তি হয় ১০ হাজার ৯২৪টি এবং বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৪১ হাজার ৫৭৯টি। ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল ৫১ হাজার ৫৫৪টি। ২০১৩ সালে দায়ের হয় ১২ হাজার ৯৫৮টি, নিষ্পত্তি হয় ৭ হাজার ৪৭৩টি, বিচারাধীন থাকে ৫৭ হাজার ৯৪টি। ২০১৫ সালে দায়ের হয় ১৪ হাজার ২৮৪টি, নিষ্পত্তি হয় ১৩ হাজার ৪৫৭টি এবং বিচারাধীন থাকে ৬২ হাজার ১৫৭টি। ২০১৬ সালে দায়ের হয় ১৬ হাজার ৯৬৫টি, নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৮৫৭টি এবং বিচারাধীন থাকে ৬৯ হাজার ৩২৬টি। ২০১৭ সালে দায়ের হয় ১৯ হাজার ৫৩৩টি, নিষ্পত্তি হয় ১২ হাজার ১১৯টি এবং বিচারাধীন থাকে ৭৬ হাজার ৭৭০টি। ২০১৮ সালে দায়ের হয় ১৭ হাজার ২১৪টি, নিষ্পত্তি হয় ১২ হাজার ৫৬০টি এবং বিচারাধীন থাকে ৮১ হাজার ৪৪৪টি রিট। ২০১৯ সালে দায়ের হয় ১৬ হাজার ৪১২টি, নিষ্পত্তি হয় ১০ হাজার ৬টি এবং বিচারাধীন থাকে ৮৭ হাজার ৮৫৩টি। ২০২০ সালে দায়ের হয় ১১ হাজার ৯১৮টি, নিষ্পত্তি হয় ৬ হাজার ৪৭১টি এবং বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ৯১ হাজার ১৯৬টি রিট। ২০২১ সালে দায়ের হয় ১৩ হাজার ৮৩৯টি, নিষ্পত্তি হয় ৭ হাজার ৯৭০টি, বিচারাধীন থাকে ৯৭ হাজার ৭৯টি। ২০২২ সালে দায়ের হয় ১৬ হাজার ৮৩৪টি এবং নিষ্পত্তি হয় ১১ হাজার ৩৫৫টি। বছর শেষে বিচারাধীন থাকে ১ লাখ ২ হাজার ৫৯৫টি রিট মামলা।বেঞ্চ বাড়ানোর পরামর্শ ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করা হয়। শিশুর অভিভাবকত্ব নিয়েও বেশ কিছু রিট হয়েছে। প্রতিকার হয়তো আইনে আছে, কিন্তু সেগুলো অধিকাংশই ফেইল করতে শুরু করেছে। এ জন্য মানুষ মনে করছে, আদালতে আসা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে তিনি মনে করেন, যে পরিমাণ রিট বিচারাধীন আছে তা নিষ্পত্তি করতে বেঞ্চ বাড়ানো প্রয়োজন।এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মো. মোয়াজ্জেম হোছাইন আজকের পত্রিকাকে বলেন, প্রধান বিচারপতি প্রয়োজন অনুসারে বেঞ্চ নির্ধারণ করেন। তাই বেঞ্চ বাড়বে কি না সেটা একান্তই প্রধান বিচারপতির বিষয়।আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে রিট মামলা কমে যাবে। Great)

Check Also

গাজীপুর সিটি নির্বাচন: লাঙলের প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা

গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন সিটি …