নগরবাসীর উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা

IPL ের সকল খেলা  লাইভ দেখু'ন এই লিংকে  rtnbd.net/live

মাহাতাব উদ্দিন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কেউ কেউ তো বলেন, কোনো দিন তাঁকে নাকি হাসতেই দেখেননি। বয়স ৩৫ বছর। মাঝারি উচ্চতা। উচ্চতার তুলনায় ওজনের আধিক্য চোখে পড়ে। মহাখালী বাণিজ্যিক এলাকায় একটা বায়িং হাউসে হিসাবরক্ষকের কাজ করেন। বেতন যা পান, স্বামী-স্ত্রী কোনোমতে চালিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু দুই সন্তানসহ চারজনের পরিবার চালিয়ে নিতে নাভিশ্বাস উঠে যায়। অন্য দিনের মতো সেদিনও অফিসে ঢুকে গম্ভীর মুখে নিজের চেয়ারটা টেনে বসে কাজ শুরু করেন মাহাতাব। বেলা তখন সাড়ে ১১টা কি ১২টা হবে, ঘাড়ের পেছনে চিনচিন ব্যথা অনুভব করেন তিনি। কিছুক্ষণ পরে ব্যথা তীব্রতর হয় আর দেখতে দেখতেই পাশের টেবিলে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সহকর্মীরা পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরান। তারপর ধরাধরি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখেন রক্তচাপ অনেক বেশি, ১৬০ / ১১০। ডাক্তার ওষুধ লিখে দেন। পাশাপাশি তিনি মাহাতাব উদ্দিনকে কিছুঅতিগুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেন। তিনি বলেন, শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও ওষুধ ছেড়ে দেওয়া যাবে না বা ডোজ কমিয়ে ফেলা যাবে না। এতে প্রেশার বেড়ে গিয়ে স্ট্রোক, কিডনির রোগ, অন্ধত্বসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যসমস্যা ঘটতে পারে। নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি পরিমিত সুষম খাবার খেতে হবে। বেশি লবণ খাওয়া যাবে না। ধূমপান সম্পূর্ণ নিষেধ। অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ওজন কমাতে এবং যতটা সম্ভব স্ট্রেসমুক্ত থাকতে হবে।সাধারণত উচ্চ রক্তচাপের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা বোঝার উপায় হলো নিয়মিত মাপা। এ ক্ষেত্রে রক্তের চাপ মাপার যন্ত্র দ্বারা দুটি সংখ্যা রেকর্ড করা হয়। দুটি রিডিংয়ের মধ্যে বড় সংখ্যা বা ওপরের মানটি হলো সিস্টোলিক চাপ। হৃৎপিণ্ড থেকে প্রতি স্পন্দনে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালনের সময়ে এই চাপ সৃষ্টি হয়। রিডিং দুটির মধ্যে ছোট সংখ্যা বা নিচের মানটি হলো ডায়াস্টোলিক চাপ। রক্ত সঞ্চালনের বিপক্ষে রক্তনালির বাধা থেকে এই চাপের সৃষ্টি হয়। ধরা যাক, কারও রক্তচাপ ১২০ / ৮০ মিলিমিটার। তাহলে সিস্টোলিক চাপ হবে ১২০ এবং ডায়াস্টোলিক চাপ হবে ৮০। রক্তচাপ একেকজনের একেক রকম হয়ে থাকে। একজনের জন্য যে রক্তচাপ বেশি বা কম, তা অন্যজনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হতে পারে। রক্তের সিস্টোলিক চাপ যদি ৯০ থেকে ১২০ এবং ডায়াস্টোলিক চাপ ৬০ থেকে ৮০-এর মধ্যে থাকে, তাহলে তা স্বাভাবিক রক্তচাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদি রক্তচাপ সব সময় ১৪০ / ৯০ বা এর বেশি থাকে, ৮০ বছর বা তার অধিক বয়সীদের ক্ষেত্রে রক্তচাপ যদি ১৫০ / ৯০ বা এর বেশি থাকে, তাহলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ ধরা হয়।বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন লোক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত, যাদের অধিকাংশেরই বাস নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোয়। অন্যান্য নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশের মতো বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বেশি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ১৮-৬৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব যথাক্রমে ২৫ দশমিক ২ ও ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশসহ অন্যান্য নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশে পরিচালিত গবেষণাগুলো থেকে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকির এই কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বয়স বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ওজন অথবা স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা এবং দীর্ঘদিনের অসুস্থতা।গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরা উচ্চ রক্তচাপে বেশি আক্রান্ত হন। পরিবেশগত এবং জৈবিক কারণে নারীদের মধ্যে এর ব্যাপক বিস্তার দেখা যায়। অনেক গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির কারণ হিসেবে মানসিক চাপের কথা বলা হয়েছে। মধ্যবয়সী নারীরা বেশি মানসিক চাপে থাকেন, বিশেষ করে মেনোপজের সময়কালে। স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে সাধারণত বেশি, যা উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম একটি কারণ। পুরুষ ও নারীদের মধ্যে আচরণগত এবং শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর পার্থক্য উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হারের তারতম্যের কারণ হতে পারে।গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের হার যেখানে ২৩ দশমিক ৯, নারীদের মধ্যে সেখানে দেখা যায় ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ। আবার বয়স বিবেচনায় ৩৫-৪৪ (১৮ দশমিক ২ শতাংশ) বছর বয়সী ব্যক্তিদের তুলনায় ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের (৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ) মধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তের হার বেশি। বিভিন্ন পেশায় কর্মরতদের ২২ দশমিক ৪ শতাংশ যাঁরা আক্রান্ত, তাঁদের তুলনায় যাঁরা বেকার, তাঁদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আর এ হার ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। একইভাবে, বিবাহিতদের (২৬ দশমিক শূন্য শতাংশ) তুলনায় অবিবাহিত (৪০ দশমিক ৯ শতাংশ) অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গবেষণায় আরও দেখা যায়, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও ধনীদের মধ্যে এই হার যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৮, ৩৪ দশমিক ৯ ও ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ। আরও দেখা গেছে, প্রতিদিন যাঁরা ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমান, তাঁদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। অপরদিকে যাঁরা প্রতিদিন ৭ ঘণ্টার কম ঘুমিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং যাঁরা ৯ ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৩৬ দশমিক শূন্য শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।উচ্চ রক্তচাপের হাত থেকে বাঁচতে এখনই আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। লাল মাংস, মাখন বা তেলে ভাজা খাবার, অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার ওজন বৃদ্ধি করে। তাই পরিমিত সুষম খাদ্য গ্রহণ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।অতিরিক্ত লবণসমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পরিহার করতে হবে এবং রান্নাতেও কম লবণ ব্যবহার করতে হবে। ধূমপান, মদ্যপানকে না বলতে হবে। অতিরিক্ত ক্যাফেইনজাতীয় খাদ্য বা পানীয় খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাগ, উত্তেজনা বা মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ বেশি থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা তৈরি হতে পারে। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য মেডিটেশন করা যেতে পারে। তবে একবার উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসা সহজলভ্যতার দিকটি নজরে আনতে হবে। ওষুধের দাম যেন সবার নাগালের মধ্যে থাকে, সেদিকেও লক্ষ রাখা প্রয়োজন।লেখক: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট; কনসালট্যান্ট, ইউনিসেফ amazing)

Check Also

গাজীপুর সিটি নির্বাচন: লাঙলের প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা

গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন সিটি …