আপনি একশটা ইলিশ পান, কিন্তু মানুষ মাছের জন্য কাঁদে: এমপিকে সুলতানা কামাল

IPL ের সকল খেলা  লাইভ দেখু'ন এই লিংকে  rtnbd.net/live

‘উপকূলের ইলিশ ও জেলে’ বিষয়ক জাতীয় সংলাপে অংশ নিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অগণিত দুই কেজির ইলিশ ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিলেন এক সরকারদলীয় সংসদ সদস্য। তিনি নিজে সাম্প্রতিক সময়ে তিন কেজির ইলিশও খেয়েছেন বলেও জানান। যদিও সংলাপে উপস্থিত জেলেরা জানান, তারা মাছ পাচ্ছেন না। ধারদেনায় জর্জরিত সংসার। সেই এমপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের প্রশ্ন, আপনি বাক্সভরে মানুষকে ইলিশ দিতে পারবেন, আরেকটা মানুষ কেন মাছ-ভাতের জন্য কাঁদবে?আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জ্বল হোসেন মানিক মিয়া হলে এই সংলাপের আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ।দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় জেলা থেকে সংলাপে অংশ নেন মৎস্যজীবী ও পরিবেশবাদী সংগঠকেরা। মোংলা, পটুয়াখালী, খুলনার বিভিন্ন নদী ও সাগরে ইলিশ আহরণকারী মানুষেরা জানান তাদের অবস্থার কথা। নদীতে ইলিশ না থাকায় জীবিকায় টান পড়েছে তাদের বেশির ভাগেরই। পাশাপাশি অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার, প্রশাসনের নানা বিষয় তুলে ধরেন জেলেরা। প্রজনন মৌসুমে সরকারের দেওয়া অপ্রতুল সহায়তা এবং তা বণ্টন নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের দুর্নীতির বিষয়গুলোও আসে সংগঠক এবং গবেষকদের আলোচনায়। মৎস্য অধিদপ্তরের (ইলিশ ব্যবস্থাপনা) উপপ্রধান মাসুদ আরা মমি বলেন, মৎস্য অধিদপ্তর পদক্ষেপ না নিলে বই পুস্তকে চলে যেত ইলিশ। বিএনপি সরকারের আমলে ইলিশের উৎপাদন একেবারেই শূন্যের কোঠায় নেমে আসে জানিয়ে বর্তমান সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি।মমি বলেন, ‘ইলিশ নাই কথাটা ঠিক না। এখন উৎপাদন ৫ লাখ ৬৭ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৯ সালে জাটকা নিধন, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং গবেষণা প্রকল্প চালু হয়। ইলিশের যে উন্নয়ন সেটা এই সরকারের সময়ে হয়েছে। বেসরকারি সংস্থাও গবেষণায় সহায়তা করেছে। ২০১৫ সালে তা শেষ হওয়ার পর মাছ উৎপাদন বেড়েছে কিন্তু ইলিশের কন্ট্রিবিউশন হয়তো কম। বর্তমানে দেশের ২৯ জেলার ১৩৬টি উপজেলায় ২৪৬ কোটি টাকার ইলিশ উৎপাদন, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।’মাছ ধরা বন্ধের মৌসুমে মাসে ৪০ কেজি ভিজিএফ চাল দেওয়ার বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান বলেন, ২০০৭-৮ অর্থ বছরে ১ লাখ ৪৬ হাজার জেলেকে দেওয়া হত। এই সরকার যখন আসল, প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় ১০ কেজি থেকে ৪০ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। আমি মনে করি এটাও জেলেদের জন্য শেখ হাসিনার সানুগ্রহ সহায়তা। এখন সাত লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। ইলিশের উৎপাদন কমছে না। ধরার মানুষ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে একজন মানুষ দশটা ইলিশ পেত, এখন যদি সেখানে দশজন মানুষ যায় কয়টা ইলিশ পাবে? এক নদীতে। আপনাদের বুঝতে হবে।ইলিশসহ অন্য মাছ রক্ষায় সরকারে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান মমি।বিশেষ অতিথি হিসেবে সংলাপে অংশ নেন উপকূলীয় দুই জেলার সংসদ সদস্য। পটুয়াখালী-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম শাহজাদা বলেন, ‘ইলিশ এখন কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার বিষয় হয়ে গেছে। তরমুজের চাষ বাড়ার কারণে ইলিশ কমে যাচ্ছে।’ কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘তরমুজ খেতে নানা ধরনের সার ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। সেসব আবার নদীতে গিয়ে পড়ছে। তাই ইলিশ তাদের আবাসস্থল আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ায় জেলেরা হয়তো মাছ পাচ্ছেন না। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সরকারের নানা পদক্ষেপে সব ধরনের মাছ উৎপাদনই বেড়েছে।’ খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা ইলিশ কিনতাম আধা কেজির আশপাশের আকারের। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে ভোলা থেকে মাছ এনেছি। একেকটির ওজন সর্বনিম্ন ২ কেজি, সর্বোচ্চ ২ কেজি ৮০০ গ্রাম। বন্ধুবান্ধব, রাজনৈতিক সহকর্মী অনেকেই তা দিয়েছি। গতকাল (মঙ্গলবার) ঢাকায় আসার আগে খেয়ে এসেছি। সত্যি কথা বলি, ১৫ মিনিট পরে হাত এবং মুখ থেকে গন্ধ (ইলিশের) আসছে। পরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে, দাঁত ব্রাশ করেছি। ৬৫ দিন বন্ধ রাখার কারণে ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে।’আখতারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘পলি বাড়ায় নদীর উপকূলে ইলিশের দেখা মিলছে না। নদী খননে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক প্রচেষ্টা রয়েছে। আমাদের গবেষণা দরকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেকটি কথা, ধৈর্য সহকারে শোনেন এবং সমাধানের চেষ্টা করেন। আমরা কাছ থেকে দেখেছি, দেশের প্রতি তাঁর যে মমত্ব মায়া, এটি আমাদের অনেকের ভেতরে থাকলেও তার ভেতরে যেটি আছে এটি অনন্য। আমরা আজকে যা ভাবছি, উনি অনেক আগে ভেবে রাখেন। এই হচ্ছেন জননেত্রী।’ জেলে কার্ড বেহাত হওয়ার বিষয়ে মৎস্যজীবীদের অভিযোগের বিষয়ে এমপি বাবু বলেন, ‘জেলেদের কার্ড সাহেবদের নামে আপনি আমিই কিন্তু দিয়েছি। আমার পাশে যে কয়টা বাটপার থাকে, তাদের নাম না দিলে ওরা আবার ফেসবুকে লিখে। আমরা কিন্তু ঠিক না। অন্যের দোষ দিয়ে যাই। মৎস্য কর্মকর্তা, জেলে কর্মকর্তা কি করবেন? ওনার তো দিতেই হবে ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান সুপারিশ করেছেন। তাঁদের দোষ না। দোষী আমরা সবাই। আজকে আড়াই কেজি তিন কেজি ইলিশ পাওয়া যায়। ভোলায়, আমাকে যদি কেউ এখন বলেন আমি কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এনে দিতে পারি। ভোলায় একজন লোক পাঠাব আপনাকে আড়াই কেজি, তিন কেজি ইলিশ এনে দেব। দুই কেজি তো অহরহ। কিছুদিন আগে ছিল না। আমরা যাই বলি, নাই নাই নাই। লোক কিন্তু বাড়তেছে। …সভাপতির বক্তব্যের শুরুতেই সুলতানা কামাল, দেশের প্রচলিত নিয়ম মেনে সবাইকে মৎস্য আহরণের অনুরোধ করেন।মৎস্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান মাসুদ আরা মমির উদ্দেশ্যে সুলতানা বলেন, ‘তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার যা বলছেন, তার সুফলটা জেলেদের কাছ থেকে শুনি না কেন? যারা মাছ ধরছেন তারা শোনেন না কেন? আগে আমরা যারা ভোক্তা প্রতিদিন ইলিশ খেয়েছি, এখন কেন খেতে পারি না। যদি ইলিশের উৎপাদন এতই বেড়ে থাকে, বাবু ভাইয়ের (আখতারুজ্জামান বাবু) যে অবস্থান আছে উনি ইচ্ছে করলে ২৪ ঘণ্টাই ইলিশ খেতে পারেন কিন্তু আমি সুলতানা কামাল, সাধারণ নাগরিক আমি কিন্তু পারি না। সম্ভব না। আমাকে কেউ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২ কেজির ইলিশ সাপ্লাই (সরবরাহ) দেবে না। আমাকে কিনতে হলে কয়েক হাজার টাকা হাতে নিয়ে বাজারে যেত হবে। তাও যদি পাই। এই যে একটা তফাৎ রয়ে গেছে। এটাই আইনপ্রণেতাদের বলতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নাই। তিনি সব সময় দেশের মানুষের ভালো চান। তাঁর আন্তরিকতা নিয়ে কেউ আমরা প্রশ্ন তুলি না। কিন্তু সেই কাজগুলো হয় না কেন?’ সুলতানা কামাল বলেন, ‘সেদিন এক মন্ত্রী বলেছেন দেশের মানুষ এখন ডাল-ভাতের জন্য কাঁদে না, মাছ-ভাতের জন্য কাঁদে। বাবু ভাই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক শ টা ইলিশ মাছ পান, কিন্তু ওই মানুষটা মাছের জন্য কাঁদে কেন? মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এটাই আমার প্রশ্ন? আপনি (আখতারুজ্জামান বাবু) বাক্সভরে মানুষকে ইলিশ দিতে পারবেন, আরেকটা মানুষ কেন মাছ-ভাতের জন্য কাঁদবে? তা নিশ্চিতের দায়িত্ব আপনাদের। আপনি পারেন আমি পারি না। এই যে আপনার পারা এবং আমার না পারার মধ্যে এত পার্থক্য হবে কেন?’ সুলতানা কামাল বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু সেই সুফল সবাই পাচ্ছে না। … মমি হিসেবে না, আপনারা রাষ্ট্র, বুঝতে হবে কেন বলছেন ওনারা (জেলেরা) দেশকে ভালোবাসে না তাই এসব কথা বলছে? ওরা কি দেশের শত্রু? শুধু আমি একাই দেশকে ভালোবাসি। এই ঔদ্ধত্য আমি দেখাতে পারি? একমাত্র আমি দেশকে ভালোবাসি আর কেউ না। এই ঔদ্ধত্য থাকা উচিত না। চিন্তা করতে হবে, কেন জেলেরা বলছেন তারা মাছ পাচ্ছেন না।’অনুষ্ঠানে উপস্থিত দুই সংসদ সদস্যের উদ্দেশ্যে সুলতানা কামাল বলেন, ‘আপনারা অবকাঠামোগত উন্নয়নে যতটা নজর দিয়েছেন। সাংস্কৃতিক উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে মনোযোগী হন নাই। এটা আমার অভিযোগ। এ কারণেই জেলেদের ধরতে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার বিষয়গুলো হচ্ছে। একটা ডিসকানেক্ট (বিচ্ছিন্নতা) রয়ে গেছে। কানেকশনটা (সংযোগ) হয় নাই।মমিকে (মাসুদ আরা মমি) আরেকটা কথা বলব, ‘আপনারা সরকারি চাকরি করছেন। বাবু, শাহজাদা ভাইয়েরা কোনো একটা কারণে আইনপ্রণেতার জায়গায় গেছেন। আপনারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহে। কেন সানুগ্রহ হবে? আমার করের পয়সায় এই টাকা আসছে, করের পয়সা প্রধানমন্ত্রী কাস্টডিয়ান (দেখভাল করেন)। তিনি একা না, সরকার কাস্টডিয়ান। সেই টাকা হয়তো, জেলে ভাইদের কাছে আসছে। এটা সানুগ্রহের কি আছে? আপনারা কি কখনো চিন্তা করেন একটা মানুষের ৫ জনের সংসারে ৪০ কেজি চালে মাস চলে কি না। তারপর কারেন্ট জাল নিয়ে মাছ ধরতে যায়, আর বলেন আইন ভাঙছে। কোন বিবেকে বলেন?’তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির কথা ধরলামই না। আপনি খুব সৎভাবে ১০টা কার্ড (জেলে) দিতে চান। কোন দশজনকে দেবেন? এখানে পরিকল্পনার ব্যাপার আছে। খালি সানুগ্রহ বললে হবে না। আমরা দয়ার পাত্র হব কেন কারও? আমরা এ দেশের নাগরিক, সম্মানিত নাগরিক। আমি কর দিই। আমি আমার নাগরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করতে চাই। আমি কারও অনুগ্রহ চাই না। দয়া করে আপনারা অনুগ্রহের কথা বলবেন না আমাদের। আমার খুব মনঃকষ্ট হয়।’সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমি বারবার বলছি, প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা এক শ বার বিশ্বাস করি। আপনাদের চেয়ে বেশি দিন ধরে তাকে চিনি। জানি তিনি চান বাংলাদেশের উন্নয়ন হোক। কিন্তু অনুগ্রহ করে আমাদের অনুগ্রহের কথা বলবেন না। কেউ বাংলাদেশে এমন নাই যে নাগরিকদের অনুগ্রহ করতে পারে। তিনি (শেখ হাসিনা) তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। সদিচ্ছার সঙ্গে করছেন, প্রশংসার সঙ্গে করছেন এটা বলতে পারি। নিশ্চয়ই তাকে ধন্যবাদ জানাব। কিন্তু আমাকে কেউ অনুগ্রহ করে, সেটা গ্রহণে রাজি নই।’ awesome)

Check Also

গাজীপুর সিটি নির্বাচন: লাঙলের প্রার্থীর ইশতেহার ঘোষণা

গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে একটি পরিকল্পিত নগর হিসাবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে ইশতেহার ঘোষণা করেছেন সিটি …